নির্বাচনী হাওয়া: মানুষের কথা, পাড়ার গল্প

মারুফ আহমেদ

“আর মাত্র দুই দিন। চিৎকার চেঁচামেচি করে নিন।”
না, এটা কোনো রাজনৈতিক দলের স্লোগান নয়। ভাবতেই মন খারাপ হয়। প্রায় দুই মাস ধরে নির্বাচনের যে উচ্ছ্বাস মানুষের মনে বাসা বেঁধেছে, তার সঙ্গে ঈদের আনন্দের মতো অনুভূতি মিলেছে। ফেব্রুয়ারীর ১২ তারিখে সব মিলিয়ে যাবে জয়-পরাজয়ের হিসাব, কিন্তু কে জিতবে, কে হারবে—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এলাকা-পাড়া-মহল্লার চিৎকার-চেঁচামেচি; সমর্থকরা কোন প্রার্থীর পক্ষে আছেন, সেই তসবিহ।

নির্বাচনের কয়টা মাস দেশের আনাচে-কানাচে প্রতিটি এলাকার চিত্র বোঝার জন্য সরেজমিন পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। এই কয়টা দিন চায়ের দোকানগুলো ছিল সবচেয়ে সরব। স্থানীয় নেতা ও পাতি নেতা সবাই ব্যস্ত ছিলেন দলীয় প্রার্থীর কাজে। কিন্তু চায়ের কাপে ঝড় তুলেছেন সাধারণ মানুষ, যারা নিজে রাজনৈতিক বিশ্লেষক। টিভি টকশো থেকে বেশি, চায়ের দোকানে সরাসরি রাজনীতি নিয়ে আলোচনা ছিল রসালো ও প্রাণবন্ত। কেউ উত্তেজিত, কেউ মোলায়েম, আবার কেউ নিরব দর্শক। হাতাহাতি বা মারামারি প্রায় চোখে পড়েনি, যদিও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটেছে।

এবারের নির্বাচন তরুণ প্রজন্মের। তারা প্রতিটি আসনে নিবেদিতভাবে অংশ নিয়েছে। মাঠ সরব রেখেছেন ছোট-বড় সব কর্মীরা। বয়স কোনো বাধা হয়নি। তরুণরাই মিডিয়া সেল পরিচালনা করছেন। রাস্তায়, দোকান, বাসা-বাড়ির খালি জায়গায় বসে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। বুথের কাজ শেষ পর্যায়ে হলেও, দলীয় কর্মকান্ড কিছুটা হালকা থাকায় তারা খোশগল্প, লুডু বা চা-বিস্কুটে সময় কাটাচ্ছেন।

এলাকাবাসী মনে করছেন, দলীয় অফিস ও প্রার্থীর অস্থায়ী বুথগুলো আবেগের কারণে এত সুন্দর সাজানো হয়েছে। স্থানীয় মুরুব্বিরা তাতে বাহবা দিচ্ছেন। কেউ বলছেন, “জাতীয় নির্বাচনকে সরব রাখতে তারা একুশে বই মেলার সেরা স্টলের মতোই কাজ করেছেন।”

প্রার্থীরা হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে চলেছেন। ‘হারিজিতি নয় লাজ, মিল বহুত বড় কাজ’—এই নীতি ভোটারদের মন জয় করেছে। রাস্তার একপাশে কোনো প্রার্থী মিছিল করছে, অন্যপাশে অন্য প্রার্থী। তারা হাত মিলিয়ে মোবারকবাদ জানাচ্ছেন। পুরুষ প্রার্থী মহিলা প্রার্থীকে বোনের মর্যাদায় শুভেচ্ছা দিচ্ছেন। সহমর্মিতার এই পরিবেশ ভোটারদের আস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

কিছু কর্মী গলাবাজি বা উচ্চ শব্দের জন্য বিরক্তির কারণ হয়েছে। মিছিলে বাইকের মহড়া বা মাইকিংয়ে মসজিদের নামাজ ব্যাহত হয়েছে। অনুমতি ছাড়া দেয়ালে পোস্টার-ব্যানার লাগানো হয়েছে। ছোট বাচ্চাদের জন্য নির্বাচনের আনন্দও গুরুত্ব পেয়েছে। ধানের শীষের প্রার্থীর মার্কায় শিশুদের জন্য ঘুড়ি বিতরণ হয়েছে।

বয়স বা অসুস্থতার কারণে ভোট দিতে যাওয়া লোকদের জন্য এবার ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সা, থ্রি-হুইলার সুবিধা রাখা হয়েছে। তবে দলীয় স্বার্থে কেউ এগুলো ব্যবহার করে ভোট জড়ো করার চেষ্টা করলে ভোটারের ভোট নিশ্চিত নয়। এই মানবিক সহযোগিতার মধ্যেও কিছু জটিলতা রয়ে গেছে।

শিশুদের কাছে নির্বাচন ছিল ঈদের মতো আনন্দ। লিফলেট, স্টিকার, চকলেট—এগুলো খেলাধুলার ছলে সংগ্রহ করা হয়েছে। নির্বাচনের রাতেও রাস্তা আলোকিত হয়েছে। রাজনৈতিক দলের পার্টি অফিসের রাস্তা সাজানো হয়েছে বাতি ও আলোকসজ্জা দিয়ে।

কেন্দ্রে মোবাইল নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত এবং সাংবাদিকদের কার্ড বিতরণ নিয়ে জনগণ ও সাংবাদিকদের মধ্যে উত্তেজনা রয়েছে। নির্বাচনের স্বচ্ছতা কতটা বজায় থাকবে, তা এখনো দেখার অপেক্ষা।

সবশেষে, দেশবাসী অপেক্ষায়—একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের। আশা করা যায়, এই নির্বাচন সকল অস্থিরতাকে কাটিয়ে, শান্তির বার্তা ফিরিয়ে আনবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *