‘কৃষক কার্ড’: কৃষি খাতে ডিজিটাল বিপ্লবের সূচনা

জাকির হোসেন

পহেলা বৈশাখ, ১৪ই এপ্রিল —বাংলাদেশের কৃষি ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক দিন। ঢাকা থেকে সড়কপথে টাঙ্গাইলে আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুপুর ১২টা ২২ মিনিটে ল্যাপটপের একটি বোতাম চাপ দিয়ে দেশব্যাপী ‘কৃষক কার্ড’ বা ‘Farmers’ Card’ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন তিনি। একই সাথে ২২,০৬৫ জন কৃষকের ব্যাংক হিসাবে ২,৫০০ টাকা করে সরাসরি অনুদান প্রদান করা হয়।

টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ১৫ জন প্রান্তিক কৃষকের হাতে কার্ড ও গাছের চারা তুলে দেন। কৃষকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “যখন এই চারাগুলো বড় হয়ে ফল ধরবে, তখন আমার জন্য কিছু পাঠাবেন।”

কৃষক কার্ড একটি ডিজিটাল ডেবিট কার্ড, যা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। এটি কৃষকদের জন্য একটি ‘সার্বজনীন ডিজিটাল পরিচয়’ হিসেবে কাজ করবে, যা তাদের সরাসরি ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসবে।

কার্ডধারীরা পাবেন ১০ ধরনের সুবিধা:

১. নগদ আর্থিক সহায়তা—ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ছোট কৃষকরা বার্ষিক ২,৫০০ টাকা অনুদান পাবেন
২. সার ও বীজ ক্রয়—ন্যায্য মূল্যে কৃষি উপকরণ ক্রয়ের সুবিধা
৩. সেচ সুবিধা—সেচ সুবিধা প্রাপ্তি
৪. স্বল্প সুদে ঋণ—সহজ শর্তে কৃষি ঋণ প্রাপ্তি
৫. কৃষি যন্ত্রপাতি—কম খরচে কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার
৬. সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা—সরাসরি ভর্তুকি প্রাপ্তি
৭. মোবাইল ভিত্তিক তথ্য সেবা—আবহাওয়া ও বাজারদর সম্পর্কিত তথ্য
৮. কৃষি প্রশিক্ষণ—কৃষি সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ
৯. পোকা দমন পরামর্শ—কীটনাশক ও পোকা দমন বিষয়ক পরামর্শ
১০. কৃষি বীমা—বীমা সুবিধা ও ন্যায্য মূল্যে পণ্য বিক্রয়ের সুযোগ

কর্মসূচিটি তিন ধাপে বাস্তবায়িত হবে:

প্রাক-পাইলট পর্যায় (এপ্রিল ২০২৬)
১০ জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি কৃষি ব্লকে বাস্তবায়ন । ২২,০৬৫ জন কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, এর মধ্যে ২০,৬৭১ জন (৯৩.৭%) ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ছোট কৃষক । ব্যয় ধরা হয়েছে ৮.৩৪ কোটি টাকা ।

পাইলট পর্যায় (আগস্ট ২০২৬)
১৫টি উপজেলায় সম্প্রসারণ পরিকল্পনা

জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণ
আগামী চার বছরের মধ্যে দেশব্যাপী সম্প্রসারণ । ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষককে কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ।

কৃষকদের জমির পরিমাণ অনুযায়ী পাঁচটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে:

| শ্রেণী | জমির পরিমাণ | সংখ্যা (প্রাক-পাইলটে) |
| ভূমিহীন | ৫ শতাংশের কম | ২,২৪৬ জন |
| প্রান্তিক | ৫-৪৯ শতাংশ | ৯,৪৫৮ জন |
| ছোট | ৫০-২৪৯ শতাংশ | ৮,৯৬৭ জন |
| মাঝারি | ২৫০-৭৪৯ শতাংশ | অন্তর্ভুক্ত নয় |
| বড় | ৭৫০ শতাংশের বেশি | অন্তর্ভুক্ত নয় |

প্রাথমিকভাবে শুধু ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ছোট কৃষকদের অনুদান দেওয়া হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “বর্তমান নির্বাচিত সরকারের লক্ষ্য কৃষকদের আত্মনির্ভরশীল ও আর্থিকভাবে সলভেন্ট করা। তাই আমরা এই ‘কৃষক কার্ড’ দিয়েছি।”

তিনি আরও বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং বর্তমান নির্বাচিত সরকারও বিশ্বাস করে যে, এই দেশের কৃষকরা যদি ভালো থাকে, এই দেশের কৃষকরা যদি বাঁচে, তাহলে পুরো বাংলাদেশ ভালো করবে এবং পুরো বাংলাদেশের মানুষ ভালো থাকবে।”

প্রধানমন্ত্রী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সময়কার কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচির কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, *”শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচি চালু করেছিলেন, যার মাধ্যমে আমরা দেখেছি বাংলাদেশ প্রায় খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছিল।”

প্রকল্প সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ জানান, এই কার্ড সার, বীজ, ক্ষতিপূরণ ও ভর্তুকি বিতরণে অনিয়ম কমাতে সাহায্য করবে এবং প্রকৃত কৃষকদের চিহ্নিত করতে সহজতর করবে।

তিনি বলেন, “কৃষকরা কার্ড ব্যবহার করে নির্ধারিত ডিলারদের কাছ থেকে কৃষি উপকরণ ক্রয় করতে পারবেন।” ধীরে ধীরে সব কৃষককে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।

কৃষি খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্যোগ ভর্তুকি ও প্রণোদনা বিতরণে স্বচ্ছতা বাড়াবে, সুবিধাভোগীদের মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমাবে এবং কৃষকদের সেবা প্রাপ্তি সহজ করবে।

তবে বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে:
– প্রকৃত কৃষকদের চিহ্নিতকরণ
– ডাটাবেস হালনাগাদ
– ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাথে খাপ খাওয়ানো
– মাঠ পর্যায়ে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি

বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সাবেক সভাপতি ও গ্লোবাল ভিলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, “কৃষক কার্ড একটি ইতিবাচক উদ্যোগ যা প্রকৃত কৃষকদের চিহ্নিত করতে সাহায্য করবে। তবে চার বছরের বাস্তবায়ন সময়সীমা দীর্ঘ, এটি সংক্ষিপ্ত করা উচিত।”

তিনি আরও বলেন, কৃষক নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে কাজ করতে হবে।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশীদ সংবাদ সম্মেলনে জানান, “কৃষক কার্ডের মূল লক্ষ্য কৃষকদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা, প্রযুক্তি-নির্ভর আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কৃষকদের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন।”

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *