আমরা কি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছি? 

জাকির হোসেন

বিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক সভ্যতায় দাঁড়িয়ে আমরা যখন নিজেদের খুব উন্নত ভাবি, ঠিক তখনই কোথাও যেন বড় একটা ফাঁক তৈরি হয়। আকাশচুম্বী দালান, হাতের মুঠোয় বিশ্ব—সবই আছে। কিন্তু অদ্ভুত এক অন্ধকার আমাদের চারপাশ ঘিরে আছে। আমরা আজ এক অসভ্য বর্বর তিমিরে নিমজ্জিত। বাইরে থেকে সব কিছু ঝকঝকে মনে হলেও ভেতরে ভেতরে এক কুত্সিৎ কলঙ্কের কালো থাবা আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে।

ছোট মানুষ বিশ্ব নিয়ে কথা বলা ঠিক নয়, তাই শুধু আমাদের এই বাংলাদেশের কথাই বলি। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত আর শরৎচন্দ্রের মতো অমর সাহিত্য যেখানে আমাদের ধমনিতে মিশে থাকার কথা, সেখানে সেই সাহিত্য আর অবিনাশী গান চর্চার মানুষ কমে যাচ্ছে কেন? সমাজ, সংস্কৃতি কিংবা অর্থনীতির যে মূলমন্ত্র থাকার কথা ছিল, তা কি আমাদের ভেতর কোনোদিন ছিল?

৪৭ থেকে ৭০, আবার ৭১ থেকে ২০২৬—আমরা কেবল রক্ত থেকে রক্তই দিয়ে যাচ্ছি। সাধারণ মানুষের জীবনের বিষাদ যেন কাটতেই চায় না। আলোর মুখ দেখা আমাদের জন্য কি তাহলে খুব বড় বিলাসিতা? যে জনগণ শিক্ষা, সভ্যতা আর সংস্কৃতির আলোয় আলোকিত হওয়ার কথা ছিল, তারা কেন আজ মারমুখী এক সংস্কৃতির ধারক হয়ে উঠছে?

চারপাশে তাকালে কেবল এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা দেখা যায়—কে কাকে ঠকিয়ে ওপরে উঠবে। সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি আর ভেজালের বেড়াজালে আমরা এমনভাবে বন্দী যে, শ্বাস নেওয়ার জায়গা নেই। হাসপাতালে ডাক্তার, অফিসে কর্মকর্তা—সবাই যেন একেকজন ওস্তাদ। সবাই সবাইকে ঠকাচ্ছে। কিন্তু এই ঠকবাজির প্রতিযোগিতায় দিনশেষে কি কেউ জিতছে?

সবাই আজ মহাপণ্ডিত। কেউ কাউকে মানতে চায় না। যদি মানেও, তবে তার পেছনে থাকে কোনো না কোনো স্বার্থ। অথচ আসল স্বার্থ যে কী—তা বোঝার লোক পৃথিবীতে খুব কমই দেখা যায়। ক্ষণিকের এই পার্থিব জগৎ তো নিছকই এক খেলাঘর। আজ আছি, কাল নেই। তবুও কেন এই অনিয়ম, এই বিশৃঙ্খলা? খুন, ধর্ষণ, মাদক আর জুয়ার নেশায় আমরা কোন পথে হাঁটছি? প্রশাসন কখনো গরম, কখনো বরফের মতো শীতল—এই রহস্যের সমাধান আমাদের কারোরই জানা নেই।

আমরা কে? কোথায় থেকে এসেছি? কোথায় যাব? আমাদের করণীয় কী? এই প্রশ্নগুলো আমরা নিজেদের করতে ভুলে গেছি। একবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখুন তো, নিজেই নিজেকে চিনতে পারেন কি না?

পৃথিবীটা খুব অল্প সময়ের। শুরু যার আছে, তার শেষও আছে। আমরা যদি আজ ভালো না হই, তবে ভালো হওয়ার সুযোগটা আর কবে পাব? আসুন, স্বার্থের হিসাব সরিয়ে রেখে মানবতার দুয়ারটা সবার জন্য খুলে দিই। নিজে ভালো থাকি, অন্যকে ভালো থাকার একটা সুযোগ করে দিই।

হয়তো এই ক্ষুদ্র প্রয়াসেই আমাদের এই দেশটা আবার মানুষের মতো মানুষের দেশে পরিণত হবে। অন্তত সেই আশায় তো বেঁচে থাকা যায়। কারণ, শেষ পর্যন্ত তো আমরা মানুষই, আর মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত—মানুষের জন্য ভালোবাসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *