জার্গেন হাবারমাসের মৃত্যু: সার্বজনীন ইউরোপীয় দর্শনের ভ্রম ভেঙে পড়ল

১৪ মার্চ ২০২৬ জার্মানির স্টার্নবার্গে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিক জার্গেন হাবারমাস। বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর। তাঁর প্রকাশনী সংস্থা সুহরকাম্প ভেরলাগের ঘোষণায় এই মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই ইউরোপ-আমেরিকার বুদ্ধিজীবী মহলে শোকের ছায়া নেমে আসে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেরৎস বলেন, “জার্মানি ও ইউরোপ তাদের সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদকে হারাল।”

কিন্তু এই মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তির প্রস্থান নয়—এটি একটি যুগের অবসান। মিডলইস্ট আইয়ের সম্পাদকীয় বিভাগে প্রকাশিত এক মতামত প্রবন্ধে এই মৃত্যুকে “সার্বজনীন ইউরোপীয় দর্শনের ভ্রমের অবসান” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

হাবারমাস ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জার্মানির সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিক। তাঁর পূর্বসূরী থিওডোর আডোর্নো ও ম্যাক্স হর্কহেইমারের “ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল” বা সমালোচনামূলক তত্ত্বের ধারা তিনি নতুন মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত থিওরি অফ কমিউনিকেটিভ অ্যাকশন তাঁর ম্যাগনাম ওপাস—যেখানে তিনি “যোগাযোগমূলক যুক্তি” (communicative rationality) ধারণাটি উপস্থাপন করেন।

তাঁর মূল তর্ক ছিল: মানুষের মুক্তি সম্ভব শুধুমাত্র বিনা প্রয়োজনে ও বিনা জবরদস্তিতে সংলাপের মাধ্যমে। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভাষার মধ্যেই পারস্পরিক বোঝাপড়ার সম্ভাবনা নিহিত আছে। এই আদর্শ “পাবলিক স্ফিয়ার” বা জনসাধারণের ক্ষেত্র তত্ত্বটি আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি হতে পারে বলে তিনি দাবি করেন।

কিন্তু এই সুন্দর তত্ত্বের পেছনে লুকিয়ে ছিল একটি গভীর বৈশ্বিক অসমতা।  হাবারমাস “সার্বজনীন ইউরোপীয় দর্শনের ভ্রম” (illusion of a universal European philosophy) ধারণাটির প্রতিনিধিত্ব করতেন।

হাবারমাসের মৃত্যুর সময়টা ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৪ মার্চ ২০২৬—ঠিক দুই সপ্তাহ আগে তাঁর “প্রিয় ইসরায়েলি সেটলার কলোনি” গাজায় নতুন করে তাণ্ডব চালাচ্ছিল বলে মিডলইস্ট আই উল্লেখ করে।

এখানেই দেখা যায় হাবারমাসের দর্শন ও রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে বিরাট ফাটল। একদিকে তিনি ছিলেন গণতন্ত্র, যুক্তি ও মুক্ত সংলাপের কঠোর সমর্থক। ২০২১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শেখ জায়েদ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন কারণ দের স্পিগেল ম্যাগাজিনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বৈরাচার, বাকস্বাধীনতার অভাব ও ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেই সময় তাঁর এই সিদ্ধান্তকে গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর অবিচল প্রতিশ্রুতির প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়।

কিন্তু একই হাবারমাস ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের সমর্থনে নিরব ছিলেন। তিনি গাজায় চলমান গণহত্যাকে “গণহত্যা” হিসেবে স্বীকার করতে অস্বীকার করেন, যদিও ফিলিস্তিনি কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ১৬ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭২,০০০ ছাড়িয়েছে, যার বেশিরভাগই শিশু, নারী ও বৃদ্ধ।

কেন একজন দার্শনিক, যিনি গণতন্ত্র, যুক্তি ও মুক্ত সংলাপের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তিনি সেটলার-ঔপনিবেশিক দখলদারিত্বের সমর্থনে কথা বলবেন? এর কারণ হিসেবে মনে করা হয় জার্মান এলিটদের “নাৎসি অপরাধের প্রতি গভীর অপরাধবোধ” । দশকের পর দশক ধরে এই অপরাধবোধ জার্মান বুদ্ধিজীবীদের ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনে উৎসাহিত করেছে, যা তাঁদের নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক নীতিবোধের সাথে সাংঘর্ষিক।

হাবারমাসের দর্শনের আরেকটি দুর্বল দিক ছিল এর গভীর ইউরোসেন্ট্রিক ধাঁচ। স্ট্যানফোর্ড এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ফিলোসফির তথ্য অনুযায়ী, দার্শনিক এমি অ্যালেন ও এনরিকে দুসেলেরা হাবারমাসের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, হাবারমাসের “আলোচনা নীতিশাস্ত্র” (discourse ethics) আধুনিকীকরণ তত্ত্বের ধারণাগুলোর উপর নির্ভরশীল, যা একটি “ইউরোপীয় আধুনিকতার উন্নয়নগত শ্রেষ্ঠত্ব” বোঝায়।

হাবারমাস দাবি করতেন, তাঁর “পোস্টমেটাফিজিক্যাল চিন্তা” সকল মানব বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের জন্য প্রাসঙ্গিক। তিনি মনে করতেন, অক্ষীয় যুগের (axial age) সমস্যাগুলো সব মানব সংস্কৃতিতে বিদ্যমান, তাই ইউরোপীয় দর্শন সার্বজনীনভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু এই দাবি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—যখন তিনি কনফুসিয়াস বা অন্যান্য অ-ইউরোপীয় চিন্তাবিদদের ব্যাখ্যা করেছেন, তখন তাঁর ব্যাখ্যা ছিল “পক্ষপাতদুষ্ট” এবং নিজের পছন্দের পরিভাষায় চালিত।

এই ইউরোসেন্ট্রিজম তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানেও প্রতিফলিত হয়েছে। যখন ইউরোপের বাইরের বিশ্ব—বিশেষ করে আরব ও মুসলিম বিশ্ব—তাঁর দর্শনের ক্ষেত্রে দাঁড়ায়, তখন তিনি দ্বৈত মানদণ্ড প্রয়োগ করেছেন। ইউরোপের জন্য গণতন্ত্র ও মানবাধিকার, কিন্তু ফিলিস্তিনের জন্য দমন ও দখলদারিত্ব—এই ছিল তাঁর অবস্থানের সারসংক্ষেপ।

২০১০-এর গোড়ার দিকে হাবারমাসকে প্রায়শই “শেষ ইউরোপীয়” বলা হতো। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নকে জাতীয়তাবাদ ও বৈশ্বিক পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক একীকরণের মডেল হিসেবে দেখতেন। তাঁর ২০০৮ সালের বই আখ, ইউরোপা (Ach, Europa) এই উদ্বেগের প্রকাশ।

কিন্তু এই “ইউরোপীয়তা” ছিল একটি সংকীর্ণ, পশ্চিমা-কেন্দ্রিক ধারণা। হাবারমাসের মৃত্যুর মাধ্যমে ইউরোপীয় দর্শনের সেই “সার্বজনীনতার দাবি” চূড়ান্তভাবে ভেঙে পড়েছে, যা দশকের পর দশক ধরে বিশ্বের বাকি অংশের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

আজ যখন গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ চলছে, যখন ইউরোপ নিজেই ডানপন্থী জাতীয়তাবাদের হুমকির মুখে, তখন হাবারমাসের “যোগাযোগমূলক যুক্তি” ও “আলোচনাভিত্তিক গণতন্ত্র” তত্ত্বগুলো তাদের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করছে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে মানুষ যুক্তির মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করতে পারে। কিন্তু যখন ক্ষমতার ভারসাম্য অসম, যখন এক পক্ষের কাছে আধুনিক অস্ত্র আর অন্য পক্ষের কাছে শুধু রক্ত ও আর্তনাদ, তখন “মুক্ত সংলাপ” একটি বিলাসিতা মাত্র।

হাবারমাসের প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের সবচেয়ে উদ্ধৃত দার্শনিকদের একজন—২০০৭ সালে টাইমস হায়ার এডুকেশন ম্যাগাজিনের তালিকায় মানবিক বিষয়ে সবচেয়ে উদ্ধৃত লেখকদের মধ্যে সপ্তম স্থানে ছিলেন তিনি, সিগমুন্ড ফ্রয়েড ও ইমানুয়েল কান্টেরও উপরে। তাঁর পাবলিক স্ফিয়ারের কাঠামোগত রূপান্তর (১৯৬২) আজও গণমাধ্যম ও গণতন্ত্র নিয়ে আলোচনার মূল ভিত্তি।

কিন্তু তাঁর মৃত্যু আমাদের জিজ্ঞাসা করতে বাধ্য করে: একটি দর্শন কতটা সার্বজনীন হতে পারে যখন সেটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে জন্মায়? কতটা নৈতিক হতে পারে একজন চিন্তাবিদ যখন তাঁর নিজের দেশের অপরাধবোধ অন্যের দমনকে ন্যায়সঙ্গত করে?

হাবারমাসের মৃত্যু শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়, এটি একটি “ভ্রমের” অবসান—যে ভ্রমে ইউরোপীয় দর্শন ছিল সার্বজনীন, নিরপেক্ষ ও সকলের জন্য প্রযোজ্য। বাস্তবে, এটি ছিল একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার (ইউরোপের ধর্মযুদ্ধ, আলোকপ্রাপ্তি, ফ্যাসিবাদ ও গণতন্ত্রের পুনর্গঠন) ফসল, যা অন্যান্য অঞ্চলের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

আজ, যখন বিশ্বব্যাপী দক্ষিণে দার্শনিক চিন্তার নতুন কেন্দ্র গড়ে উঠছে—লাতিন আমেরিকার বুদ্ধিজীবী ঐতিহ্য, আফ্রিকার উত্তর-আধুনিক চিন্তা, এশিয়ার বিকল্প আধুনিকতার ধারা—তখন হাবারমাসের প্রস্থান একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। একটি যুগ, যেখানে কোনো একক দর্শন “সার্বজনীন” দাবি করবে না, বরং বিভিন্ন ঐতিহ্যের মধ্যে সমতাভিত্তিক সংলাপ সম্ভব হবে।

হাবারমাস নিজেই একবার বলেছিলেন, গণতন্ত্র নির্ভর করে মানুষের বিশ্বাসের উপর যে “ভবিষ্যতকে সামূহিকভাবে গড়ার কিছু ক্ষেত্র এখনো বাকি আছে”। কিন্তু সেই গণতন্ত্র যদি শুধু শক্তিশালীদের জন্য হয়, যদি “যুক্তি” শুধু দখলদারদের অস্ত্র হয়, তবে সেটি হাবারমাসের সেই সুন্দর আদর্শ নয়, বরং তার বিকৃতি।

জার্গেন হাবারমাসের মৃত্যু আমাদের এই প্রশ্ন রেখে গেল: আমরা কি শুধু যুক্তি ও সংলাপের মধ্যে মুক্তি খুঁজব, নাকি ক্ষমতার অসমতাও দেখব? ইউরোপীয় দর্শনের সার্বজনীনতার ভ্রম ভেঙে যাওয়ার পর, হয়তো সত্যিকারের বৈশ্বিক সংলাপ শুরু হতে পারে—যেখানে ফিলিস্তিনও কথা বলবে, গাজাও শোনা যাবে।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *