তিস্তা সংকট: পানি, কূটনীতি ও বাংলাদেশের বিকল্প পথ

তিস্তার উপর পশ্চিমবঙ্গ আরও দুটি খাল খনন করে অতিরিক্ত পানি অপসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। খাল খননের জন্য ইতোমধ্যে ১০০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের কৃষির জন্য তিস্তার পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আন্তর্জাতিক নদী হিসেবে ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ কখনোই পানির ন্যায্য হিস্যা পায়নি। এর সঙ্গে যদি নতুন দুটি খালের মাধ্যমে পানি অপসারণ করা হয়, তাহলে নদী হিসেবে তিস্তার অস্তিত্বই ইতিহাসের খাতায় নাম লেখাতে পারে।

ভারতের গণমাধ্যমে জমি অধিগ্রহণের খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশ সরকার দিল্লির কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইবে বলে জানিয়েছে। এই জটিল পরিস্থিতির বাইরে এসে কিছু মৌলিক সমীকরণ বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আমরা জানি, কোনো নদী যখন একাধিক দেশের রাজনৈতিক সীমানা অতিক্রম করে, তখন সেটিকে আন্তর্জাতিক নদী বলা হয়। এ ধরনের নদীর ক্ষেত্রে এককভাবে কোনো দেশ বড় ধরনের স্থাপনা গ্রহণ করতে গেলে সংশ্লিষ্ট সব দেশের সঙ্গে সমন্বয় করা উচিত। একইভাবে পানি বণ্টনের ক্ষেত্রেও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি কখনোই যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। যেখানে ছিটমহলের মতো জটিল সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়েছে, সেখানে তিস্তার পানি বণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দিল্লি দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের ওপর দায় চাপিয়ে সময়ক্ষেপণ করে আসছে।

বাংলাদেশের সৌভাগ্য, এটি একটি ভাটির দেশ। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই পৃথিবীর অন্যতম উর্বর ভূমির মালিক বাংলাদেশ। গঙ্গা অববাহিকার ব-দ্বীপে পলিমাটি জমে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলের উর্বরতা শত শত বছর ধরে মানুষকে এখানে বসবাসে আকৃষ্ট করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি আমাদের দুর্ভাগ্যও—উজানের দেশগুলো যখন পানির ন্যায্য বণ্টনে আগ্রহ দেখায় না, বরং সময়ক্ষেপণেই বেশি মনোযোগী থাকে। মাঝেমধ্যে পানি বণ্টনের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে রাজ্যের ওপর দায় চাপানো আসলে একটি কূটনৈতিক কৌশল বলেই প্রতীয়মান হয়।

ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বা দ্বিমুখী নীতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন চীন নদীর উৎসমুখে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। তখন ভারতের বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদসহ অনেকেই চীনের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সরব হন—লেখালেখি করেন, টক শোতে আলোচনা করেন, সভা-সমাবেশে বক্তব্য দেন। অথচ বাংলাদেশের সঙ্গে পানিবণ্টনের ক্ষেত্রে ভারতের যে অবস্থান, সে বিষয়ে তারা প্রায় নীরব থাকেন। এটি একই সঙ্গে ভণ্ডামি ও দ্বিমুখী নীতির উদাহরণ।

দীর্ঘদিন ধরে একটি বাস্তবতা স্পষ্ট—দ্বিপাক্ষিকভাবে ভারতের সঙ্গে এই ইস্যুগুলোর সমাধান খোঁজা মানেই অনেক সময় তা সময়ক্ষেপণে পরিণত হয়। তাই আন্তঃনদী পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে একটি বহুপাক্ষিক নদী কমিশন গঠন জরুরি। বিদ্যমান যৌথ নদী কমিশনের পাশাপাশি চীন ও নেপালকে যুক্ত করা প্রয়োজন। এখানে কোনো দেশ বড় বা ছোট—এটি বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়।

চীন কোনো পরম ‘ভাল’ দেশ নয়—আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো দেশই নিজের স্বার্থের বাইরে দীর্ঘদিন অন্যের স্বার্থ রক্ষা করে না। কিন্তু বাংলাদেশের নদী সমস্যা সমাধানে চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সরাসরি সীমান্ত বা সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নেই। তবে নদীর উৎস ও প্রবাহের কারণে উভয় দেশের স্বার্থ এখানে যুক্ত। অন্যদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় চীন ও ভারত অনেক ক্ষেত্রেই বিপরীতমুখী অবস্থানে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের কাছ থেকে দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক উদ্যোগ না থাকায় কেবল দ্বিপাক্ষিক সমাধানের অপেক্ষায় থাকা বাস্তবসম্মত নয়।

সমুদ্রসীমা নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়েছে। তিস্তার পানিবণ্টনও একই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশ যখন তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনকে যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়, তখন ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল উদ্বেগপূর্ণ। এমনকি ভারতীয় বিশ্লেষকরাও প্রকল্পটির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। বাস্তবতা হলো—ভারত যদি তিস্তার পানি সরিয়ে নেয়, বাংলাদেশ তা সরাসরি ঠেকাতে পারবে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ হাত গুটিয়ে বসে থাকবে। বাংলাদেশের সামনে বিকল্প পথ রয়েছে।

একটি পথ হতে পারে—জাতিসংঘকে সম্পৃক্ত করে বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত করা। আরেকটি পথ—চীনকে যুক্ত করে ত্রিদেশীয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা। যদি ভারত এই দুটি পথের কোনোটিতেই সায় না দেয়, তাহলে শেষ বিকল্প হিসেবে নদীর উৎসমুখে চীনের বাঁধ নির্মাণ পরিকল্পনাকে সমর্থন দেওয়ার প্রশ্নও বিবেচনায় আসতে পারে।

একই সঙ্গে, ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নিজস্ব সম্ভাবনাকেও কাজে লাগাতে হবে। দেশে বর্ষাকালে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত হয় এবং বিপুল পরিমাণ পানি সাগরে চলে যায়। এই অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণের জন্য খাল ও নদী পুনখনন করে জলাধার বা রিজার্ভার তৈরি করা জরুরি, যাতে শুষ্ক মৌসুমে কৃষিতে সেই পানি ব্যবহার করা যায়।

নদীকেন্দ্রিক একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা দ্রুত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সময়ের দাবি। ভবিষ্যতে সুপেয় পানির অভাবকে কেন্দ্র করে বিশ্বে সংঘাতের আশঙ্কা অমূলক নয়। তাই সম্ভাবনা ও ঝুঁকি—উভয় দিক বিবেচনায় নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা, পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন এখনই জরুরি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *