জাকির হোসেন
কারা গিলে খাচ্ছে দুস্থ মানুষের প্রাপ্য অধিকার? এই প্রশ্নগুলো এখন শুধু গুঞ্জন নয়—এটি টাঙ্গাইলজুড়ে এক গভীর জনঅভিযোগ।
পবিত্র ঈদুল আযহা ২০২৬ উপলক্ষে টাঙ্গাইল পৌরসভাসহ জেলার ১১টি পৌরসভায় ভিজিএফ (VGF) কর্মসূচির আওতায় দুস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে চাল বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সরকারি হিসাবে এটি একটি মানবিক উদ্যোগ। উদ্দেশ্য—ঈদের আনন্দ যেন অন্তত একবেলা খাবারের নিশ্চয়তার মাধ্যমে গরিব মানুষের ঘরেও পৌঁছে যায়।
টাঙ্গাইল পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে জানান, এবারের ঈদুল আযহায় টাঙ্গাইল পৌরসভায় মোট ৪৬.২৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ এসেছে। এই বরাদ্দের আওতায় ৪,৬২৫ জন কার্ডধারীকে ১০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা। তিনি আরও বলেন, সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করে ১৮টি ওয়ার্ডে দুই দিনে এই বিতরণ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে।
কাগজে-কলমে সবকিছু নিখুঁত। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন গল্প।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ অভিযোগ—সরকারি নির্দেশনায় ১০ কেজি চাল দেওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে বহু সুবিধাভোগীর হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৭ থেকে ৮ কেজি চাল। অর্থাৎ, প্রতি কার্ডে ২ থেকে ৩ কেজি করে চাল উধাও হয়ে যাচ্ছে বিতরণের মাঝপথেই।
এই চিত্র শুধু একটি ওয়ার্ড বা একটি পৌরসভার নয়। অভিযোগ উঠেছে জেলার ১১টি পৌরসভাতেই একই ধরনের অনিয়ম চলছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, চাল মাপার সময় ওজনে কারচুপি করা হচ্ছে। কোথাও বস্তা আগেই কম ভরে রাখা হচ্ছে, কোথাও আবার তাড়াহুড়োর সুযোগে সুবিধাভোগীদের বুঝে ওঠার আগেই কম চাল ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—যারা প্রতিবাদ করছেন, তাদের অনেককে অপমান, ভয়ভীতি কিংবা চাল না দিয়েই ফিরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
একজন বৃদ্ধা নারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকার যদি ১০ কেজি দেয়, তাহলে আমরা ৭ কেজি পাই কেন? গরিবের হকও কি চুরি হবে?”
এই প্রশ্ন শুধু একজন বৃদ্ধার নয়—এটি এখন হাজারো অসহায় মানুষের প্রশ্ন।
জেলা প্রশাসনের বরাদ্দপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতিটি সুবিধাভোগীর জন্য ১০ কেজি চাল বরাদ্দের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। বিভিন্ন পৌরসভার জন্য নির্ধারিত চালের পরিমাণ, উপকারভোগীর সংখ্যা এবং অনুমোদিত হিসাব সরকারি নথিতে সুস্পষ্ট। অর্থাৎ, বরাদ্দ কম আসেনি—অভিযোগ উঠছে বিতরণ ব্যবস্থার মাঝপথে ‘অদৃশ্য সিন্ডিকেট’ সক্রিয় হওয়ার বিরুদ্ধে।
প্রশ্ন উঠছে—যদি প্রতি কার্ডে ২ কেজি করে চাল কম দেওয়া হয়, তাহলে হাজার হাজার কেজি চাল কোথায় যাচ্ছে?
কার গুদামে জমা হচ্ছে গরিব মানুষের ঈদের খাবার? কারা এই দুর্নীতির নেপথ্যে?
এই দুর্নীতি কেবল খাদ্য আত্মসাৎ নয়—এটি রাষ্ট্রের মানবিক সহায়তাকে লুট করার শামিল। একজন দরিদ্র মানুষের জন্য ২ কেজি চাল মানে হয়তো দুই দিনের খাবার। সেই খাবার চুরি করা মানে তার সন্তানের মুখের ভাত কেড়ে নেওয়া।
সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের আস্থা। কিন্তু যদি সেই কর্মসূচির মাঠপর্যায়ে এমন লুটপাট চলে, তাহলে মানুষের মনে রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
ঈদ কেবল উৎসব নয়, এটি সাম্য ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়। সেই ঈদের সহায়তা যদি অসাধুদের পকেটে চলে যায়, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়—এটি নৈতিক বিপর্যয়।
এখন দেখার বিষয়—এই অভিযোগ কি তদন্তের টেবিলে চাপা পড়ে যাবে, নাকি সত্যিই গরিব মানুষের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।