জেরুজালেমের পবিত্র ভূমি—আল-আকসাকে ঘিরে থাকা এলাকা—হাজার বছর ধরে তিনটি বড় ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। আজ সেই অঞ্চল নতুন এক ধরনের উত্তেজনার মুখোমুখি। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটিশ মুসলিম পডকাস্ট দ্য থিংকিং মুসলিম–এ প্রকাশিত এক বিস্তারিত আলোচনায় ফিলিস্তিনি শিক্ষাবিদ ও আল-আকসা মসজিদের সাবেক মিডিয়া ও জনসংযোগ কর্মকর্তা ডঃ আবদুল্লাহ মারুফ গভীর উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, আল-আকসা মসজিদ ও এর আশপাশের ঘটনাবলী নিয়ে বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়ের নীরবতা এবং বিস্ময়কর উদাসীনতা এক ঐতিহাসিক ভুলে পরিণত হতে পারে।
ড. মারুফের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে “রেড হিফার” বা লাল গাভীর অনুষ্ঠান। এটি একটি বাইবেলীয় বিধান, যা ইহুদি ধর্মগ্রন্থের অংশ বুক অফ নাম্বারস–এর ১৯ নম্বর অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, জেরুজালেমে তৃতীয় মন্দির নির্মাণের আগে পুরোহিতদের আচার-অনুষ্ঠানের শুদ্ধি অর্জনের জন্য এই বিশেষ গাভীর বলি প্রয়োজন। সেই গাভী হতে হবে সম্পূর্ণ লাল, কোনো দাগছোপ ছাড়া; কখনো জোয়াল পরানো হয়নি এবং কোনো শারীরিক ত্রুটি নেই।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্য থেকে পাঁচটি “নিখুঁত” লাল গাভী ইসরায়েলে আনা হয়। বর্তমানে সেগুলো রাখা হয়েছে প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যের স্থান শিলোহ–এর একটি খামারে। ঐতিহাসিকভাবে শিলোহ ছিল প্রাচীন ইসরায়েলীয় বিচারকদের আসন। এখন গাভীগুলোর বয়স ধর্মীয় আচার সম্পাদনের উপযুক্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে বলা হচ্ছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ঘটনাকে কেবল ধর্মীয় প্রস্তুতি হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না; এর মধ্যে একটি বড় রাজনৈতিক বার্তাও নিহিত থাকতে পারে।
জেরুজালেমের টেম্পল মাউন্ট—যা মুসলমানদের কাছে আল-হারাম আল-শরীফ নামে পরিচিত—আজ দুই ভিন্ন ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাতের কেন্দ্রে। কিছু ইহুদি ধর্মীয় সিয়োনিস্ট গোষ্ঠী এবং মার্কিন ইভানজেলিকাল খ্রিস্টানদের একটি অংশ বিশ্বাস করে, মেসাইয়ার আগমনের জন্য জেরুজালেমে তৃতীয় মন্দির নির্মাণ অপরিহার্য।
ড. মারুফের ভাষ্য অনুযায়ী, এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে বহু দূর এগিয়ে গেছে। তাঁর দাবি, মন্দির নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে—
- আচার-অনুষ্ঠানিক পুরোহিতের পোশাক প্রস্তুত করা হয়েছে;
- মন্দিরের জন্য পবিত্র পাত্র তৈরি করা হয়েছে;
- লেবি বংশের প্রায় ৫০০ যুবককে পুরোহিত হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে;
- সম্ভাব্য মন্দিরের স্থাপত্য নকশাও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই মন্দির নির্মাণের সম্ভাব্য স্থান নিয়ে বিতর্ক। বর্তমানে যেখানে ডোম অফ দ্য রক ও আল-আকসা মসজিদ অবস্থিত, সেই এলাকাকেই অনেক ধর্মীয় গোষ্ঠী প্রাচীন মন্দিরের স্থান হিসেবে বিবেচনা করে। অর্থাৎ, তৃতীয় মন্দির নির্মাণের প্রশ্নটি সরাসরি বিশ্বের তৃতীয় পবিত্রতম মুসলিম স্থাপনার ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।
রেড হিফার প্রসঙ্গটি সাম্প্রতিক সংঘাতের সঙ্গেও যুক্ত বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর—অর্থাৎ ৭ অক্টোবরের হামলার দুই দিন আগে—হাজার হাজার ইসরায়েলি সেটলার আল-আকসা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে এবং তৃতীয় মন্দির নির্মাণের স্লোগান দেয়। এর পরদিনই ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস “আল-আকসা ফ্লাড” নামে পরিচিত অভিযানে হামলা চালায়।
ড. মারুফ ও অন্যান্য বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এই ঘটনাক্রমকে কেবল কাকতালীয় বলা কঠিন। তাঁদের মতে, আল-আকসা মসজিদকে ঘিরে বাড়তে থাকা উত্তেজনা এবং মন্দির নির্মাণের প্রস্তুতি সংঘাতের অন্যতম অন্তর্নিহিত কারণ। এই প্রসঙ্গে তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু–এর একটি মন্তব্যও উল্লেখ করেন—যেখানে তিনি বলেছিলেন, হামাস ক্ষমতায় থাকা ইসরায়েলের জন্য দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হতে পারে। সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন, এর পেছনে কি কোনো বৃহত্তর ধর্মীয়-রাজনৈতিক কৌশল কাজ করছে?
আলোচনায় আরও একটি জটিল দিক উঠে এসেছে—মার্কিন ইভানজেলিকাল খ্রিস্টানদের সমর্থন। তাঁদের একটি অংশ বিশ্বাস করে, জেরুজালেমে মন্দির পুনর্নির্মাণ যিশু খ্রিস্টের দ্বিতীয় আগমনের পূর্বশর্ত। যদিও ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্থে মেসাইয়ার পরিচয় নিয়ে মতভেদ রয়েছে, তবু বাস্তব লক্ষ্য—মন্দির নির্মাণ—নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এক ধরনের কৌশলগত ঐক্য তৈরি হতে পারে।
কিছু কর্মী প্রকাশ্যেই বলেছেন, তারা প্রথমে মন্দির নির্মাণে একসঙ্গে কাজ করবেন। পরে দেখা যাবে আগত মেসাইয়া প্রথমবার আসছেন, নাকি দ্বিতীয়বার। এই অস্বাভাবিক জোট মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এবং ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ধর্মীয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর শক্তি বাড়াতে পারে।
ড. মারুফের সবচেয়ে কঠোর সমালোচনা মুসলিম বিশ্বের প্রতি। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গাজায় যুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয় বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্র হলেও জেরুজালেমে আল-আকসার দীর্ঘমেয়াদি হুমকি নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হচ্ছে। গাজা যুদ্ধ চলাকালে জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি বাড়িঘর ধ্বংসের হার ১৯৬৭ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন, কিন্তু এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে।
ড. মারুফের মতে, এই “মনোযোগের বিভাজন” কিছু গোষ্ঠীকে টেম্পল মাউন্ট সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ করে দিতে পারে। যখন বিশ্বের দৃষ্টি গাজার যুদ্ধের দিকে কেন্দ্রীভূত, তখন জেরুজালেমে নীরবে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটতে পারে।
বর্তমান বাস্তবতায়, দীর্ঘ যুদ্ধে গাজা প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এই সময়েই রেড হিফারগুলো বলি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হচ্ছে। ড. মারুফ ও অন্য বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, এই ধর্মীয় আচার কেবল প্রতীকী ঘটনা নয়; এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বা সামরিক পদক্ষেপের পূর্বাভাসও হতে পারে।
ড. আবদাল্লাহ মারুফের সাক্ষাৎকারে তাই এক ধরনের সতর্কবার্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর মতে, আল-আকসা মসজিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে পরিকল্পনা ও বিতর্ক চলছে, তার গভীরতা ও গুরুত্ব অনেকেই পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারছেন না। রেড হিফারের মতো প্রাচীন ধর্মীয় বিধানকে আধুনিক রাজনৈতিক এজেন্ডার সঙ্গে যুক্ত করা এমন এক জটিল বাস্তবতা তৈরি করছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে আরও বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তাঁর আহ্বান পরিষ্কার—মুসলিম বিশ্বকে কেবল চলমান সংঘাত নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ধর্মীয়-রাজনৈতিক প্রস্তুতির দিকেও নজর দিতে হবে। তাঁর ভাষায়, আল-আকসা কেবল একটি স্থাপনা নয়; এটি ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। তাই এর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদাসীনতা মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও পরিচয়ের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। তাঁর মতে, এই মুহূর্তে নীরবতা এক ঐতিহাসিক ভুলে পরিণত হতে পারে—যার পরিণতি হতে পারে সুদূরপ্রসারী ও গভীর।
—
তথ্যসূত্র: The Thinking Muslim Podcast – “The Plot Against Al-Aqsa: Red Heifers & the Third Temple”