শিক্ষা নীতিতে চমক নয়, চাই দায়িত্বশীল পরিকল্পনা

আসিফ বায়েজিদ

স্কুলে ভর্তি নিয়ে আপনাকে কোনো পাজল সলভ করতে দেওয়া হয়নি। স্কুলে ভর্তির বিষয়টি ইতিমধ্যে মিমাংসিত—শিক্ষার্থী তার ক্যাচমেন্ট এরিয়ার স্কুলেই ভর্তি হবে। আপনারা সেই সুযোগটি নিশ্চিত করবেন। এই কাজটি কতটা কঠিন?

অনুরোধ, টিনএজারদের মতো এড্রেনালিন রাশের বশবর্তী হয়ে প্রতিদিন চটকদার ও চমকদার সিদ্ধান্ত নেবেন না। এমনভাবে সিদ্ধান্ত নিন, যাতে পরে তা ফিরিয়ে নিতে না হয়। আপনার মন্ত্রণালয় কোনো ছেলেখেলা বিষয়ক দপ্তর নয়। প্রতিরক্ষা, অর্থ, বাণিজ্যসহ অন্য গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মতোই—কিছু ক্ষেত্রে তাদের চেয়েও বেশি—গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়। তাই তাকে তার প্রাপ্য গুরুত্ব দিন।

আপনি এত চমক দেখাতে চান, কিন্তু একবারও তো বললেন না—২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে পিসা টেস্টের অন্তর্ভুক্ত করবেন। অথচ হইচই করে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার দিকে নেমে গেলেন। কিন্তু আপনার দেশের একটি শিশু যে বেয়ার মিনিমাম বাংলা পড়ে বুঝতে পারে না, যোগ-বিয়োগ করতে পারে না—এই মৌলিক সক্ষমতা কেন অর্জিত হচ্ছে না, সেটি সমাধান করা কি আপনার দায়িত্ব নয়?

আপনার প্রধানমন্ত্রী বলছেন, শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখানো হবে। তখন কি আপনি বলবেন না যে ভাষা শেখা মূলত মাতৃভাষার উপর নির্ভরশীল? আগে মাতৃভাষার ভিত্তি শক্ত করতে হবে। নীতি তৈরি হবে, পাঠ্যক্রম ঠিক হবে, উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ হবে—তারপর তৃতীয় ভাষা শেখানোর কথা আসবে। এই বিষয়গুলো যদি আমাদেরই বলতে হয়, তাহলে আপনি দায়িত্ব নিলেন কেন?

আপনি কানাই নন যে আপনাকে সারাক্ষণ আমাদের প্রশ্ন করতে হবে—আপনি খেই হারালেন কেন। আপনি কোনো নাবালক প্রেমিক নন, বাঁদর নাচের খেলোয়াড়ও নন। ভাইরাল কোনো ম্যাজিক দেখিয়ে জনগণের মন জয় করা আপনার কাজ নয়। নিজের মতো করে কোমর বেঁধে নীতি বানিয়ে ফেলা আপনার দায়িত্বও নয়।

আপনার প্রকৃত কাজ হলো—গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কয়েকটি শক্তিশালী টিম গঠন করা। এসব টিম হবে মাল্টি ও ক্রস-ডিসিপ্লিনারি—বিশেষজ্ঞ, গবেষক, কর্মী এবং বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সমন্বয়ে। তারা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করবে এবং একটি রিপোর্টের মাধ্যমে সমন্বিত ও সামগ্রিক সুপারিশ দেবে।

এই টিমগুলোর সমন্বয়ে একটি শিক্ষা কমিশনধর্মী কনসোর্টিয়াম গড়ে উঠতে পারে। আপনার কাজ সেই কনসোর্টিয়াম গঠন করা। আমার মতো একজন মাস্টার্স পাস মানুষ বিষয়টি বোঝে, কিন্তু ডক্টোরেট করেও আপনি যদি তা না বোঝেন—তাহলে সেটি বিস্ময়কর। যদি বোঝেন, তবে আমাদের জানান—এ বিষয়ে কী উদ্যোগ নিয়েছেন। আর যদি না নিয়ে থাকেন, তাহলে কেন নেননি?

আপনি যদি আপনার ব্যক্তিগত শিক্ষাজীবনের অভিজ্ঞতাকে হাতিয়ার করে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার করতে চান, তবে বলতেই হয়—এতে আমাদের আস্থা তৈরি হয় না। এখন রক্তচক্ষু দেখান, ব্যাকস্ট্যাব করেন, জীবন নষ্ট করে দেন—যা খুশি করুন। এগুলো সহ্য করেই আমরা এতদিন বেঁচে আছি।

বাংলাদেশ এখন আর কারও তৈল দেওয়ার অবস্থায় নেই। আপনি দায়িত্ব নিয়ে অফিসে যোগ দিয়েছেন—এতে আমাদের ওপর কোনো এহসান করেননি। তাই আপনার কাছে আমাদের প্রত্যাশা একটাই—আপনি জবাবদিহি দেখান। আর যদি মনে করেন দায়িত্ব পালনে অপারগ, তাহলে সেটিও স্পষ্ট করে বলুন। আপনার কাজ কী—আপনি যদি তা না-ই বুঝে থাকেন, পরিষ্কার করে জানিয়ে দিন। জনগণ তখনও আপনাকে ধন্যবাদ দেবে।

 

আসিফ বায়েজিদ :লেখক, সমালোচক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *