কাতার-তুরস্ক পাইপলাইন: হরমুজ বাইপাসের নতুন স্বপ্ন তুরস্কের

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হুমকির মুখে পড়েছে। এই সংকটের মধ্যে তুরস্ক একটি বড় স্বপ্ন দেখছে—মধ্যপ্রাচ্যের এনার্জি রুট পুনরায় বিন্যস্ত করে নিজেকে একটি আঞ্চলিক এনার্জি হাবে পরিণত করা। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এই পরিকল্পনাকে ‘পাইপ ড্রিম’ বা অবাস্তব স্বপ্ন বলে আখ্যা দিচ্ছেন ।

হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন হয়। যুদ্ধের কারণে এই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ৯০ শতাংশের বেশি কমে গেছে, যার ফলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলার থেকে বেড়ে ১২০ ডলারে পৌঁছেছে—প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি ।

ইউরোপের টিএফএফ গ্যাস চুক্তির দাম ৩০ ইউরো থেকে বেড়ে ৬০-৭০ ইউরোতে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প রুটের সন্ধানে বিশ্বজুড়ে তোড়জোড় শুরু হয়েছে ।

এ অবস্থার প্রেক্ষাপটে তুরস্কের এনার্জি ও প্রাকৃতিক সম্পদমন্ত্রী আলপারসলান বায়রাক্তার একাধিক উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছেন:

কাতার-তুরস্ক গ্যাস পাইপলাইন
কাতারের গ্যাস একটি পাইপলাইনের মাধ্যমে তুরস্কে এবং সেখান থেকে ইউরোপে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বায়রাক্তার বলেন, “ধরুন আপনার এলএনজি সুবিধাগুলো আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, আপনার এলএনজি রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। আপনি ইতোমধ্যে হরমুজ দিয়ে যেতে পারছেন না। এমন একটি পাইপলাইনের কথা ভাবুন যা নির্দিষ্ট পরিমাণ গ্যাস তুরস্ক এবং ইউরোপে নিয়ে যাবে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে পরিণত হতে পারে” ।

কিরকুক-সেহান তেল পাইপলাইন
ইরাকের কিরকুক থেকে তুরস্কের সেহান বন্দর পর্যন্ত ১.৫ মিলিয়ন ব্যারেল ক্ষমতাসম্পন্ন এই পাইপলাইনটি তুরস্কের প্রধান সম্পদ। বায়রাক্তার জানান, এই পাইপলাইনের ক্ষতিগ্রস্ত উত্তরাঞ্চল মেরামত এবং বসরা পর্যন্ত সম্প্রসারণ করে দক্ষিণ থেকে উত্তরে প্রবাহ সক্ষম করলে হরমুজ বাইপাসে দৈনিক ১.৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন সম্ভব ।

তুর্কমেনিস্তান গ্যাস
কাস্পিয়ান সাগরের মাধ্যমে আজারবাইজান ও জর্জিয়া হয়ে তুর্কমেন গ্যাস আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে ।

সিরিয়ান তেল একীকরণ
সিরিয়ার স্বাভাবিকীকরণের সাথে সাথে দেশটির তেলক্ষেত্রগুলোকে ইরাক-তুরস্ক পাইপলাইনের সাথে যুক্ত করার প্রকল্পও এখন আলোচনায় রয়েছে ।

তুরস্কের এই মহৎ পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে যে সকল বড় বাধা রয়েছে:

অবকাঠামো সীমাবদ্ধতা: জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক রিসার্চের এনার্জি বিভাগের প্রধান ক্লাউডিয়া কেমফার্ট মনে করেন, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে তুরস্ক সংক্ষিপ্ত মেয়াদে বড় সরবরাহ বিঘ্ন মোকাবেলায় সক্ষম নয়। তার ভূমিকা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কৌশলগত এবং মধ্যমেয়াদি হবে ।

বিপুল ব্যয়: নতুন পাইপলাইন নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় হবে। সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের পুনরাবৃত্তি করতে কমপক্ষে ৫ বিলিয়ন ডলার, আর ইরাক থেকে জর্ডান, সিরিয়া বা তুরস্ক হয়ে আরও জটিল রুটে ১৫-২০ বিলিয়ন ডলার লাগতে পারে ।

নিরাপত্তা ঝুঁকি: ইরাকে বিস্ফোরক ও জঙ্গি উপস্থিতি, সিরিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা, এবং ওমান রুটে মরুভূমি ও পর্বতমালা পার হওয়ার প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে ।

বিদ্যমান বিকল্পের সীমিত ক্ষমতা: সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের অতিরিক্ত ক্ষমতা ৩-৫ মিলিয়ন ব্যারেল, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি-ফুজাইরাহ পাইপলাইনে আরও ৭ লাখ ব্যারেল—মোট বিকল্প ক্ষমতা ৩.৫-৫.৫ মিলিয়ন ব্যারেল, যা হরমুজের ২০ মিলিয়ন ব্যারেলের তুলনায় অপ্রতুল ।

তুরস্কের এনার্জি মন্ত্রী বায়রাক্তার আশাবাদী যে বর্তমান সংকট পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও অর্থনৈতিক সুবিধা সৃষ্টিকারী বড় আঞ্চলিক প্রকল্পগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণকে ত্বরান্বিত করতে পারে ।

তবে বাস্তবতা হলো, তুরস্কের স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তাগত বাধা অতিক্রম করতে হবে। হরমুজ ব্লকের পর বিশ্বব্যাপী এনার্জি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবনা শুরু হলেও, তুরস্কের ‘পাইপ ড্রিম’ কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, তা সময়ই বলবে ।

তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই, টিআরটি ওয়ার্ল্ড, আনাদোলু এজেন্সি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *