সৈয়দ নাজমুস সাকিব
সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হব—ভাবিনি। ব্যালট পেপার আমার হাতে আসার আগেই সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে কেন্দ্রে ভোটার হাজির হয়ে গেছেন ভোট দিতে—এ কথা বললে অনেকেই হয়তো বিশ্বাস করবেন না। সত্যি বলতে, আমার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। জীবনে এর আগে এত স্বতঃস্ফূর্তভাবে, এত মানুষের ভোট দেওয়ার আগ্রহ আমি চোখের সামনে দেখিনি। কয়েকজন ভোটারকে পেয়েছি, যারা শুধু ভোটের দিনে ভোট দেবেন বলে নতুন জামা কিনেছেন। অবিশ্বাস্য উন্মাদনা—কিন্তু আনন্দের।
ব্যক্তিগতভাবে দিনটি আমার জন্য ছিল ভীষণ পরিশ্রমের। পুরো ২০২৫ সালে যতটা পরিশ্রম করিনি, একদিনে যেন তার চেয়েও বেশি করতে হয়েছে। সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এক সেকেন্ডের জন্যও সিট ছেড়ে উঠিনি। টানা নিজের দায়িত্ব পালন করেছি। এরপর মাত্র দুই মিনিটের জন্য ওয়াশরুমে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। দুপুর ১২টা পর্যন্ত এক ফোঁটা পানিও মুখে তোলা হয়নি। পিপাসায় গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু নড়ার উপায় ছিল না—ভোটারের লাইন ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছিল। দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটে লাঞ্চ করেছি। ততক্ষণে ঘাড়ের পেছনে ব্যথা শুরু হয়েছে, রক্তচাপ বাড়ার লক্ষণও টের পাচ্ছিলাম।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তা নিশ্চিতে সীমাহীন সহায়তা করেছেন। আনসার সদস্যরা ভোটারদের সঠিক কক্ষ খুঁজে পেতে যেভাবে সহায়তা করেছেন, তাতে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা বেড়েছে। অনেক সময় বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে আমরা তাঁদের কড়া সমালোচনা করি। কিন্তু এদিন তাঁরা দায়িত্বশীলতার যে পরিচয় দিয়েছেন, তাতে তাঁরা সত্যিই নীরব নায়ক বলে মনে হয়েছে।
প্রচুর মানুষ উৎসাহ নিয়ে কেন্দ্রে এলেও প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি ভোটার আসেননি। তাঁদের কাছে পৌঁছাতে না পারা, তাঁদের আস্থা অর্জন করতে না পারার দায় আমাদের সবার। গণতন্ত্রে অংশগ্রহণ কেবল আয়োজনের বিষয় নয়; মানুষের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি বিষয় চোখে পড়েছে—অনেকেই ‘গণভোট’ বিষয়টি ঠিকমতো বুঝতে পারছেন না। কীসের ‘হ্যাঁ’, কেন ‘হ্যাঁ’; কীসের ‘না’, কেন ‘না’—এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট ধারণা তাঁদের নেই। বারবার বোঝানোর পরও অনেকে বিভ্রান্ত ছিলেন। কয়েকজন তো গণভোটে ভোট না দিয়েই কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। এখনো অনেকের রাজনৈতিক চেতনায় মূলত ‘মার্কা’ বা প্রতীকই প্রধান পরিচিতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার জগৎ আর বাস্তবতার মধ্যে যে বড় ফারাক রয়েছে, সেটিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সহনশীলতার ঘাটতিও চোখে পড়েছে। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রবীণ ভোটার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এতক্ষণ লাগছে কেন? সকাল থেকে দাঁড়িয়ে আছি। ভোট কি এবারও দিতে পারব না?” তাঁর কণ্ঠে ছিল তীব্র বিরক্তি। কিন্তু যখন তাঁর ভোট দেওয়ার পালা এলো এবং পুরো প্রক্রিয়াটি—দুই ব্যালটে সিল মারা, স্বাক্ষর করা, নাম ও নম্বর লেখা—নিজ চোখে দেখলেন, তখন কিছুটা ধাতস্থ হলেন। দিন শেষে নিজের আচরণের জন্য ক্ষমাও চাইলেন। এই ঘটনাই বুঝিয়ে দেয়, প্রক্রিয়ার জটিলতা অনেক সময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না।
সৌভাগ্যবশত, ন্যূনতম কোনো ধরনের সমস্যা ছাড়াই আমি সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি। ব্যক্তিগতভাবে এতে আমি ভীষণ সন্তুষ্ট। এতদিন পর এত মানুষের মুখে ভোটের আনন্দ ফিরে আসতে দেখা—এ দৃশ্য নিজেই এক বড় প্রাপ্তি। বাংলাদেশের মানুষ ভোট দিতে কতটা ভালোবাসেন, তা নিজের চোখে না দেখলে অনেকেরই বিশ্বাস হবে না।
আমার দায়িত্ব ছিল ঢাকার লালবাগে, ঢাকা–৭ আসনের ৩১ নম্বর কেন্দ্রে। এখানে আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাই বলেছি। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জায়গায় অনিয়মের খবর ইতিমধ্যে দেখেছি। এতসব অনিয়ম খুব দ্রুত বিদায় নেবে—এমন আশা করা কঠিন। তবু দিনশেষে আশা করি, পরিস্থিতি কিছুটা হলেও স্থিতিশীলতার দিকে যাবে। পৃথিবীর সবচেয়ে সৎ মানুষও যদি বাংলাদেশের নেতৃত্বে থাকেন, তবু দ্রুত সবকিছু ঠিক করা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়। তারপরও আশা—এই একটাই আমাদের সম্বল।
গত দেড় বছরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দলের বেশিরভাগ কর্মকাণ্ড আমাকে হতাশ করেছে। তবে দিনশেষে তিনি যে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন নিশ্চিত করেছেন, সে জন্য তাঁর প্রতি ধন্যবাদ প্রাপ্য বলে মনে করি।