রাজশাহীতে বাড়ছে এইচআইভি সংক্রমণ

 

রাজশাহীতে এইচআইভি সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসেই নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ২৮ জন আক্রান্ত। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এর মধ্যে ১৭ জনের সংক্রমণের উৎস সমকামী সম্পর্ক। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি এখনই নিয়ন্ত্রণে না আনলে এটি অঞ্চলের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের ভিওএলসিটি (Voluntary Counseling and Testing) সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে এইচআইভি পরীক্ষা চালুর পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৯৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে বেশিরভাগই রাজশাহী মহানগর ও পার্শ্ববর্তী জেলার বাসিন্দা।

সমকামী সম্পর্কেই বেশি সংক্রমণ

রামেক হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সমকামী সম্পর্কের মধ্য দিয়ে সংক্রমণের হার বেড়েছে। সচেতনতার অভাব, সামাজিক লজ্জা এবং গোপন সম্পর্কের কারণে অনেকেই পরীক্ষার বাইরে থাকেন। চিকিৎসকদের ভাষায়, “অনেকেই নিজেদের ঝুঁকিপূর্ণ মনে করলেও সমাজের ভয়ে পরীক্ষা করাতে চান না। ফলে সংক্রমণ চেইন ভেঙে ফেলা সম্ভব হচ্ছে না।”

একজন এইচআইভি বিশেষজ্ঞ বলেন, “সমকামীদের মধ্যে নিরাপদ যৌন আচরণ প্রচারের বিষয়টি এখনও বাংলাদেশে অবহেলিত। এই বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা বা শিক্ষার সুযোগ নেই। ফলে অনেকে অজান্তেই ভাইরাসটি ছড়িয়ে দিচ্ছেন।”

চিকিৎসা নিতে দূর-দূরান্তে যেতে হয়

রাজশাহীতে এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ এইচআইভি চিকিৎসা কেন্দ্র ছিল না। ফলে আক্রান্তদের চিকিৎসা ও ওষুধ নিতে নিয়মিত বগুড়া যেতে হতো। এতে সময়, অর্থ ও মানসিক কষ্ট—সবকিছুই বাড়তো। তবে এবার রামেক হাসপাতালে গড়ে তোলা হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ এইচআইভি ট্রিটমেন্ট সেন্টার, যেখানে রোগীরা ওষুধ, কাউন্সেলিং ও নিয়মিত চিকিৎসা পাবেন।

রামেক হাসপাতালের পরিচালক জানান, “রাজশাহীর মতো একটি অঞ্চলে এতো বেশি সংক্রমণ উদ্বেগজনক। এজন্য স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। নতুন কেন্দ্র চালু হলে রোগীরা বগুড়া না গিয়েই চিকিৎসা নিতে পারবেন।”

ঝুঁকিতে তরুণরাও

চিকিৎসকদের মতে, রাজশাহীর নতুন আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই তরুণ, বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পড়াশোনার জন্য, কেউ আবার কর্মসংস্থানের খোঁজে শহরে এসেছে। শহুরে পরিবেশে গোপন সম্পর্কের সুযোগ ও সুরক্ষার অভাব এই সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে।

একজন সমাজকর্মী বলেন, “রাজশাহীর তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যৌন শিক্ষা প্রায় অনুপস্থিত। নিরাপদ যৌন আচরণের বিষয়ে সচেতনতা না থাকায় তারা নিজের অজান্তে ঝুঁকিতে পড়ছে।”

সচেতনতা ও নিরাপদ আচরণই মূল প্রতিরোধ

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এইচআইভি প্রতিরোধে মূল চাবিকাঠি হলো সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং নিরাপদ যৌন অভ্যাস। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে প্রচার ও শিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা না হলে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে।

রামেকের চিকিৎসকরা বলছেন, “এইচআইভি এখন আর কেবল একটি চিকিৎসাগত সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ইস্যুও। তাই সমাজের সব স্তরে বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা দরকার। যত তাড়াতাড়ি মানুষ বুঝবে, তত দ্রুত সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব।”

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *