একজন নির্বাচন পর্যবেক্ষকের দেখা ভোটের দিনের অদৃশ্য কারচুপি

মুহাম্মদ মঈন উদ্দিন

১৭ বছরের চাকরি জীবনে কয়েকবার স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ হয়েছিল। চাকরিকালীন সময়ে কখনোই সেই অভিজ্ঞতাগুলো প্রকাশ্যে আনি নাই। কিন্তু আজ মনে হলো—বাংলাদেশের নির্বাচনের দিনে কী ধরনের অনিয়ম ঘটে, যা আমি নিজ চোখে দেখেছি, সেগুলো জানা জরুরি।

এই অভিজ্ঞতার আলোকে খুব কাছ থেকে দেখেছি—নির্বাচনে কীভাবে বিভিন্ন কৌশলে জালিয়াতি করা হয়। যারা নির্বাচন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত, তাদের জন্য এই অভিজ্ঞতাগুলো গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থাকতে পারে।

সবচেয়ে প্রচলিত অনিয়ম হলো জাল ভোট। পুরোনো কৌশল—একজনের ভোট আরেকজন দেওয়া। সময় ও প্রযুক্তির অগ্রগতিতে বিষয়টি কঠিন হলেও এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সাধারণত কেন্দ্রের ভেতর থেকে যখন “সিগন্যাল” আসে, তখনই এই প্রক্রিয়া শুরু হয়। সবকিছু এতটাই সাজানো থাকে যে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকে না। হাতে একটি স্লিপ থাকলেই চলতে থাকে। একই ব্যক্তিকে বারবার বিভিন্ন পরিচয়ে ভোট দিতে পাঠানো হয়—যতক্ষণ না কোনো প্রার্থীর এজেন্ট আপত্তি তোলেন। এ কারণে এজেন্টদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—ভোটারের পরিচয় নিশ্চিত করা।

এর বাইরে, বাস্তব নির্বাচনী পর্যবেক্ষণে দেখা কিছু ঘটনা এখানে তুলে ধরা হলো—

লাইনে মানুষ, বুথ ফাঁকা

একটি কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল বাইরে লম্বা লাইন, অথচ ভেতরে কোনো ভোটার নেই। সব বুথ ঘুরেও কাউকে ভোট দিতে দেখা গেল না। পোলিং অফিসারকে প্রশ্ন করলে তিনি দায় এড়িয়ে বললেন, “ভেতরের দায়িত্ব আমার, বাইরে কী হচ্ছে জানি না।”

বাইরে গিয়ে প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হয়। সকাল থেকেই লাইনের সামনে ২৫–৩০ জনের একটি দল দাঁড়িয়ে আছে—তাদের কাজ লাইনে থাকা, কিন্তু ভোট দিতে না যাওয়া। এতে কৃত্রিম জট তৈরি হয়। পিছনের মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে বিরক্ত হয়ে ভোট না দিয়েই বাড়ি ফিরে যায়।

এই কেন্দ্রগুলোতে প্রতিপক্ষ প্রার্থীর ভোট বেশি থাকায় কৌশলটি নেওয়া হয়েছিল। লক্ষ্য করা গেল—একজন ভোট দিয়ে এসে আবার লাইনের পেছনে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। নারী ভোটারদের ক্ষেত্রেও একই কৌশল প্রয়োগ হয়। ভেতরে গেলে এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে ঘোরানো হয়, শেষ পর্যন্ত ভোট না দিয়েই তাদের বের করে দেওয়া হয়। গ্রামের সহজ মানুষগুলো এতে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে যান।

ডামি এজেন্টের খেলা

অনেক কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে—প্রভাবশালী দলের এজেন্ট আছে, কিন্তু অন্য প্রার্থীর এজেন্ট নেই। প্রশ্ন করলে বলা হয়, তারা বাইরে গেছেন বা বাথরুমে। বাস্তবে দেখা গেছে, সকালেই হুমকি বা মারধরের মাধ্যমে তাদের বের করে দেওয়া হয়েছে।

এক কেন্দ্রে সব এজেন্ট উপস্থিত দেখে আশ্চর্য হয়েছিলাম। একজনকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন অন্য প্রার্থীর এজেন্ট। কিন্তু তার গলায় ঝুলছিল নৌকা প্রতীকের ব্যাজ। তাড়াহুড়ায় ব্যাজ খুলতেও ভুলে গিয়েছিল—ডামি এজেন্টের বাস্তব চিত্র।

নারী বুথে প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ

একটি নারী বুথে গিয়ে দেখা গেল—একজন মহিলা গোপন কক্ষে দাঁড়িয়ে ভোটারদের কোথায় সিল দিতে হবে তা দেখিয়ে দিচ্ছেন। প্রশ্ন করলে তিনি দাবি করেন, বয়স্ক ভোটারদের সহায়তা করছেন। পরে পোলিং অফিসার তাকে বের করে দেন।

আরেক বুথে দেখা যায়—ভোটারদের গোপন কক্ষে ঢুকতেই দেওয়া হচ্ছে না। সবার সামনে ব্যালটে সিল দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। প্রশ্নের মুখে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নীরবে সরে যান।

ভুয়া সাংবাদিকদের দাপট

আইন অনুযায়ী ভোটকেন্দ্রে ভোটার, এজেন্ট ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বাইরে কারও থাকার কথা নয়। কিন্তু সাংবাদিক পরিচয়ে অসংখ্য ব্যক্তি কেন্দ্রে ঢুকে পড়েন। অনেক সাংবাদিক কার্ড ভুয়া। এরা ভোটারদের প্রভাবিত ও ভয় দেখানোর কাজে যুক্ত থাকে। প্রশ্ন করলে তারা নীরবে সরে যায়।

নামসর্বস্ব পর্যবেক্ষক

এক কেন্দ্রে এক ব্যক্তিকে নির্বাচন পর্যবেক্ষক দাবি করতে দেখা যায়। কোন সংস্থার—জিজ্ঞেস করলে স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। পর্যবেক্ষণের বদলে ভোটে হস্তক্ষেপ করছিলেন। প্রশ্নের পর সরে পড়েন।

ভয় দেখিয়ে কেন্দ্র ফাঁকা

এক কেন্দ্রে দেখা গেল—বাইরে অনেক মানুষ, কিন্তু কেউ ভেতরে যাচ্ছে না। স্থানীয় এক শিশুর কাছ থেকে জানা গেল—মারামারি হয়েছে, ভেতরে গেলে মার খেতে হয়। ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে ভোটারদের দূরে রাখা হয়েছে।

গোপন ভোটের অধিকার হরণ

আরেক কেন্দ্রে দেখা যায়—ভোটারদের গোপন কক্ষে সিল দিতে দেওয়া হচ্ছে না। এজেন্টের সামনে সিল দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। অভিযোগের পর পোলিং অফিসার বিষয়টি এড়িয়ে যান। আমাদের সামনে সামান্য বকাবকির নাটক করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়।

এগুলো কেবল কেন্দ্রের ভেতর ও আশপাশের চিত্র। এর বাইরে, কেন্দ্র থেকে দুই কিলোমিটার দূরে ভোটার আটকে দেওয়া, বাড়ি থেকে নারী ভোটারদের এনআইডি কার্ড কেড়ে নেওয়ার মতো ঘটনাও বহুবার চোখে পড়েছে।

তবু আশাবাদ আছে—এইবার হয়তো এসব অনিয়ম হবে না। যদিও বাস্তবতা হলো, অনিয়মের চেষ্টা সব পক্ষ থেকেই চলতে থাকে।

 

 মুহাম্মদ মঈন উদ্দিন
সাবেক কর্মকর্তা, আমেরিকান এম্বাসি ঢাকা
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া অঙ্গরাজ্যে বসবাসরত

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *