লালমনিরহাটে নির্বাচনী উৎসব: ভোটার উপস্থিতিতে ঈদের আমেজ

ভোটাধিকার প্রয়োগের সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় লালমনিরহাটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমাগম দেখে তা ঈদের ছুটি নাকি জাতীয় নির্বাচন, তা বোঝা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহর থেকে প্রবল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে গ্রামের দিকে ছুটে আসছেন মানুষ, যা অনেকটাই ঈদের সময়কার পরিস্থিতির স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে এবং মানুষের ভোটাধিকার সুরক্ষিত থাকবে। ১৮ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী প্রত্যেক নাগরিকের ভোট দেওয়ার অধিকার সংবিধানের ১২২ অনুচ্ছেদে সুনিশ্চিত করা হয়েছে। এই অধিকার প্রয়োগে জনগণের এবারের স্বতঃস্ফূর্ততা গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বিগত বছরগুলোতে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে এ ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ এবং মানুষের এত ব্যাপক সমাগম লক্ষ্য করা যায়নি।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের নির্বাচন (নবম জাতীয় সংসদ) ভোটার উপস্থিতি প্রায় ৮৭% মোট ভোটার ৮ কোটি ১০ লাখ। ২০১৪ সালের নির্বাচন (দশম জাতীয় সংসদ) ভোটার উপস্থিতি প্রায় ৪০-৫০% (বিতর্কিত) প্রধান বিরোধী দল বর্জনের কারণে অংশগ্রহণ কম ছিল, ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থী নির্বাচিত। ২০১৮ সালের নির্বাচন (একাদশ জাতীয় সংসদ) ভোটার উপস্থিতি সরকারি হিসাবে ৮০%+ মোট ভোটার প্রায় ১০ কোটি ৪০ লাখ, বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের মতে প্রকৃত উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ছিল। ২০২৪ সালের নির্বাচন (দ্বাদশ জাতীয় সংসদ) ভোটার উপস্থিতি প্রায় ৪১.৮% (নির্বাচন কমিশন) প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র বর্জনে অংশগ্রহণ সীমিত ছিল মোট ভোটার ছিলো প্রায়  ১২ কোটি।

লালমনিরহাট জুড়ে ভোটারদের এই অভূতপূর্ব আগমন দেখে এলাকাবাসী বিস্মিত ও আনন্দিত। অনেকেই এই গণতান্ত্রিক উৎসবে শামিল হয়ে পড়েছেন।

রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন পর জনগণের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে এমন আগ্রহ ও স্বতঃস্ফূর্ততা দেখা যাচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। ভোটাধিকার প্রয়োগে মানুষের এই ঢল প্রমাণ করে যে, তারা দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এবং নিজেদের সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদুল হাসান বলেন, “ভোটাধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার প্রয়োগে জনগণের এমন স্বতঃস্ফূর্ততা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশের লক্ষণ। গত কয়েকটি নির্বাচনে যে অংশগ্রহণের ঘাটতি ছিল, তা পূরণে এবার জনগণ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে।”

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, আগামী নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্ন রাখতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক জানান, “প্রত্যেক ভোটারের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। যাতে কেউ তার সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”

স্থানীয় ভোটার রহিমা খাতুন বলেন, “আমার ভোট আমি দেব এটা আমার অধিকার। দীর্ঘদিন পর এমন সুযোগ এসেছে যখন আমরা মনে করছি আমাদের ভোট সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।”

আরেক ভোটার তপু সিংহ বলেন, “ঢাকা থেকে ছুটে এসেছি শুধু ভোট দিতে। এটা আমার দায়িত্ব, আমার অধিকার। দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আমার ভূমিকা রাখতে চাই।”

রেল-সড়কপথে যানবাহনের চাপ এবং মানুষের আনাগোনা দিনরাত বেড়েই চলেছে। রাত জেগে চলছে গাড়ি, বাস, মাইক্রোবাস। মনে হচ্ছে আগামী ১২ তারিখের আগেই সবাইকে বাড়ি পৌঁছাতে হবে। যেন একটি জাতীয় উৎসব চলছে লালমনিরহাট জুড়ে।

সাব্বির হোসেন

হাতিবান্ধা (লালমনিরহাট) প্রতিনিধি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *