আরিনী হক
পৃথিবীর যমজ গ্রহ হিসেবে পরিচিত শুক্রের পৃষ্ঠের নিচে লুকিয়ে আছে একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ গুহা বা লাভা টিউব—এমনই চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে নতুন গবেষণায়। নাসার তিন দশক পুরনো ম্যাগেলান মিশনের রাডার ডেটা নতুনভাবে বিশ্লেষণ করে এই আবিষ্কার করেছেন ইতালির ট্রেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশনস-এ প্রকাশিত গবেষণায় জানানো হয়, শুক্রের নিক্স মন্স নামের আগ্নেয় অঞ্চলের নিচে একটি বড় আকারের ফাঁপা সুরঙ্গের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, এটি আগ্নেয়গিরির লাভা প্রবাহের ফলে তৈরি হওয়া একটি বিশাল লাভা টিউব।
রাডার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ভূগর্ভস্থ সুরঙ্গের ব্যাস প্রায় ১ কিলোমিটার। এর ছাদের পুরুত্ব কমপক্ষে ১৫০ মিটার এবং ভেতরের খালি অংশের গভীরতা অন্তত ৩৭৫ মিটার। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই সুরঙ্গটি আরও অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
এই আবিষ্কারের পেছনে রয়েছে নাসার ম্যাগেলান মহাকাশযানের সংগ্রহ করা তথ্য। ১৯৯০ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে ম্যাগেলান সিনথেটিক অ্যাপারচার রাডার ব্যবহার করে শুক্রের পৃষ্ঠের মানচিত্র তৈরি করেছিল। তবে তখনকার প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই ধরনের সূক্ষ্ম ভূগর্ভস্থ কাঠামো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
ট্রেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের দূর সংবেদন ল্যাবরেটরির প্রধান অধ্যাপক লরেঞ্জো ব্রুজোনের নেতৃত্বে গবেষক দল আধুনিক ইমেজিং কৌশল ব্যবহার করে পুরনো রাডার চিত্রগুলো নতুনভাবে বিশ্লেষণ করেন। তারা এমন জায়গাগুলোতে নজর দেন, যেখানে পৃষ্ঠে ধসে পড়ার চিহ্ন দেখা যায়—যা সাধারণত নিচে ফাঁকা জায়গা থাকার ইঙ্গিত দেয়।
অধ্যাপক ব্রুজোন বলেন, “শুক্র সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এখনও খুব সীমিত। এই আবিষ্কার দেখায়, গ্রহটির পৃষ্ঠের নিচে কী ধরনের জটিল প্রক্রিয়া চলতে পারে, যা এতদিন কেবল ধারণার মধ্যেই ছিল।”
বিজ্ঞানীরা বলছেন, শুক্রের পরিবেশ বড় আকারের লাভা টিউব তৈরির জন্য বেশ উপযোগী। গ্রহটির মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর তুলনায় কম এবং এর বায়ুমণ্ডল অনেক ঘন। ফলে আগ্নেয়গিরি থেকে বের হওয়া গলিত লাভা দ্রুত একটি শক্ত খোলস তৈরি করে, যার নিচ দিয়ে লাভা প্রবাহিত হতে থাকে। এতে বিশাল আকারের সুরঙ্গ টিকে থাকার সুযোগ পায়।
গবেষকদের মতে, এই লাভা টিউব পৃথিবী, মঙ্গল এমনকি চাঁদে পাওয়া লাভা টিউবের চেয়েও বড় হতে পারে। শুক্রের দীর্ঘ ও প্রশস্ত লাভা চ্যানেলগুলোর সঙ্গেও এই আবিষ্কারের মিল রয়েছে।
বর্তমানে রাডার ডেটার ভিত্তিতে লাভা টিউবের একটি অংশই নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা গেছে। তবে আশপাশের ভূপ্রকৃতি ও অনুরূপ গর্তের অবস্থান বিশ্লেষণ করে গবেষকরা ধারণা করছেন, এই ভূগর্ভস্থ সুরঙ্গ কমপক্ষে ৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
এই আবিষ্কার শুক্র নিয়ে আসন্ন মহাকাশ মিশনগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির এনভিশন এবং নাসার ভেরিটাস মিশনে উন্নত রাডার ব্যবস্থার মাধ্যমে আরও স্পষ্টভাবে শুক্রের পৃষ্ঠ ও ভূগর্ভ পরীক্ষা করা হবে।
বিশেষ করে এনভিশন মিশনে থাকা সাবসারফেস রাডার সিস্টেম পৃষ্ঠের কয়েকশ মিটার নিচ পর্যন্ত অনুসন্ধান করতে পারবে। এতে ভবিষ্যতে আরও লাভা টিউব বা ভূগর্ভস্থ গুহা শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শুক্রের পৃষ্ঠে প্রায় ১ হাজার ৬০০ বড় আগ্নেয়গিরি এবং প্রায় ১০ লাখ ছোট আগ্নেয় কাঠামো রয়েছে। নতুন এই আবিষ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে, গ্রহটি হয়তো এখনও ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয়—অথবা অন্তত অতীতে এর আগ্নেয় তৎপরতা বিজ্ঞানীদের ধারণার চেয়েও বেশি জটিল ছিল।
গবেষকদের মতে, শুক্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা এই বিশাল লাভা টিউব আমাদের সৌরজগতের এই রহস্যময় গ্রহকে নতুনভাবে বুঝতে সাহায্য করবে।
সূত্র : রয়টার্স