নির্বাচন ও গণভোটের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোটকে সামনে রেখে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি দেশবাসী—কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, ছাত্র-ছাত্রী, নারী-পুরুষ, নবীন-প্রবীণ—সবার প্রতি আন্তরিক সালাম ও অভিবাদন জানান এবং আসন্ন ভোটকে জাতির জন্য এক ঐতিহাসিক ও ভবিষ্যৎনির্ধারক মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, আর মাত্র একদিন পর সারাদেশে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং এর সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট—যা সারা জাতির বহু বছরের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এ উপলক্ষে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সব শহিদকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তাঁদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ এবং স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় দেশ আজ গণতান্ত্রিক উত্তরণের এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, জুলাইয়ের যোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ছাড়া এই নির্বাচন ও গণভোট কোনোটিই সম্ভব হতো না; জাতি তাঁদের কাছে চিরঋণী। প্রত্যেক জাতির জীবনে এমন কিছু দিন আসে, যেদিন নির্ধারিত হয় রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা, গণতন্ত্রের চরিত্র ও স্থায়িত্ব এবং আগামী প্রজন্মের ভাগ্য। আসন্ন ভোটের দিনটিকে তিনি তেমনই একটি দিন হিসেবে অভিহিত করেন। এদিন নতুন সরকার গঠনের জন্য ভোট গ্রহণের পাশাপাশি গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারিত হবে।

নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শেষ হওয়ার পর নাগরিকদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্ত এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন নাগরিক হিসেবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা তুলে ধরা তাঁর নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।

প্রধান উপদেষ্টা এবারের নির্বাচনী পরিবেশকে পূর্ববর্তী যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় অধিক শান্তিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলোর সংযম, প্রার্থীদের দায়িত্বশীল আচরণ এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতার ফলে এ পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানান। এ জন্য তিনি রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, ভোটার, নির্বাচন কমিশন, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমকর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সদস্যদের ধন্যবাদ জানান।

তবে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর এবং প্রচারকালে সংঘটিত কয়েকটি সহিংস ঘটনায় প্রাণহানির কথা উল্লেখ করে তিনি গভীর বেদনা প্রকাশ করেন। গণতন্ত্রের চর্চায় কোনো প্রাণহানি কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি জানান, এবারের নির্বাচনে ৫১টি দল অংশ নিচ্ছে, যা অতীতের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় সর্বাধিক। স্বতন্ত্রসহ মোট প্রার্থীর সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। এটি একটি গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে জনগণের জাগরণের সাংবিধানিক প্রকাশ হিসেবে এ নির্বাচনকে তিনি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন।

তিনি বলেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচন নয়, একই সঙ্গে নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে। বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠন নাকি পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক বৃত্তে প্রত্যাবর্তন—এই প্রশ্নের উত্তর দেবে গণভোট।

সব প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রতি তিনি আহ্বান জানান, ফলাফল যাই হোক, দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে। বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি পরাজয়ও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সত্য—উল্লেখ করে তিনি নির্বাচনের পর ঐক্যবদ্ধভাবে নতুন বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান।

তরুণ ও নারী ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, গত ১৭ বছর ধরে ভোটাধিকার থাকা সত্ত্বেও ভোট দিতে না পারা প্রজন্ম এবার প্রথমবারের মতো সত্যিকারের রাজনৈতিক উচ্চারণের সুযোগ পাচ্ছে। দীর্ঘ বঞ্চনা ও অবদমনের পরও তারা আশা হারায়নি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথ বদলানোর সুযোগ এসেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

নারীদের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে সব গণআন্দোলনে নারীরা শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও তারা সম্মুখসারিতে ছিলেন। অর্থনীতিতে নারীদের অবদান—ক্ষুদ্র ঋণ, কুটির শিল্প, উদ্যোক্তা উদ্যোগ—দেশের পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করেছে। অথচ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে মত প্রকাশের সুযোগ থেকে তারা দীর্ঘদিন বঞ্চিত ছিলেন। এ নির্বাচন তাদের জন্য নতুন সূচনা।

তরুণ ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, একটি ভোট ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে এবং প্রমাণ করবে যে দেশ তার তরুণ ও সংগ্রামী জনতার কণ্ঠ আর হারাতে দেবে না।

নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে সরকারের সর্বোচ্চ প্রস্তুতির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসম্পন্ন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্বে রয়েছেন। প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে সিসি ক্যামেরা, বডি ক্যামেরা, ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে গণতন্ত্রের পরিসর বিস্তৃত হয়েছে। সরকারি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং কারাগারে থাকা যোগ্য নাগরিকদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি স্পষ্ট নির্দেশনার আহ্বান জানান, যেন কেউ বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা, ভয়ভীতি, কেন্দ্র দখল বা গুজব ছড়ানোর সঙ্গে জড়িত না হয়। একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না বলে তিনি সতর্ক করেন।

নির্বাচন ঘিরে গুজব ও অপতথ্য ছড়ানোর অপচেষ্টা সম্পর্কে সতর্ক করে তিনি নাগরিকদের যাচাই ছাড়া তথ্য শেয়ার না করার আহ্বান জানান। নির্বাচনবন্ধু হটলাইন ৩৩৩-এ যোগাযোগ করে সঠিক তথ্য জানার পরামর্শ দেন। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে না—এমন অপপ্রচারকে তিনি ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেন এবং দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

জুলাই সনদ সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি কোনো একক দলের ইশতেহার নয়; দীর্ঘ নয় মাস ধরে ৩০টির বেশি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা শেষে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এটি প্রস্তুত করেছে। এই সনদ ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা বহন করে।

সংস্কার বাস্তবায়নে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক বৈধতা জনগণের সম্মতি থেকেই আসে। তাই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে, যাতে নাগরিকরা সরাসরি মত প্রকাশ করতে পারেন। এ ভোটের প্রভাব বহু প্রজন্মজুড়ে থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, এই গণভোটে দেওয়া প্রতিটি ভোট সন্তানের ভবিষ্যৎ, পরিবারের নিরাপত্তা ও দেশের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। নাগরিকের দায়িত্ব ও অধিকার এই মুহূর্তে এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে।

নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার দ্রুত দায়িত্ব নেবে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব শেষ হবে—এ কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, নবনির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব অর্পণ করে তারা নিজ নিজ কাজে ফিরে যাবেন।

সবশেষে তিনি দেশবাসীকে সপরিবারে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানান। “দেশের চাবি আপনার হাতে”—উল্লেখ করে তিনি সঠিকভাবে সেই চাবি ব্যবহারের আহ্বান জানান এবং প্রার্থনা করেন, এবারের ভোটের দিন যেন নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন হয়ে ওঠে।

ভাষণের সমাপ্তিতে তিনি দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানান ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *