মারুফ আহমেদ
দেশে ফিরেই জাতির সামনে নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছিলেন তিনি। দরাজ কণ্ঠে উচ্চারিত একটি ইংরেজি বাক্য—“I have a plan”—তোলপাড় ফেলে দেয় পুরো নেটদুনিয়ায়। নিন্দুকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছোট্ট এই বাক্যটি নিয়ে কটাক্ষে মেতে ওঠে। যেন একটি ইঞ্জিনিয়ারিং পরিকল্পনাকেই রাজনৈতিক কৌশলের খাঁচায় বন্দি করার চেষ্টা। কিন্তু পঁচাতে গিয়ে অনেকেরই যেন উল্টো পা পিছলেছে। লালনের গানের সেই পংক্তি মনে পড়ে—
“জাত গেল জাত গেল বলে …”
এই নির্বাচন যেন ছিল এক আজব কারখানা। দোলাচলের ঢেউ—কোন জোটের দিকে যাবে তরী? বহু আশা-আকাঙ্ক্ষা বুকে নিয়ে দলীয় কর্মী ও দেশবাসীর সামনে আসা মানুষটি দীর্ঘ ১৭ বছর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে দেশের বাইরে ছিলেন। সুদীর্ঘ ২৫ বছর পর ফিরে পান ভোটাধিকার। বিগত ফ্যাসিস্ট হাসিনার স্টিমরোলার আর অকথ্য নির্যাতন তাঁকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল—এমন অভিযোগ তাঁর সমর্থকদের। নির্বাচনকালীন বিদ্রুপ ও কটাক্ষেও তিনি ছিলেন অবিচল। অনেকে ভেবেছিলেন, ভাইরাল হওয়া “I have a plan” টিকবে না।
কয়েক মাস ধরেই বিপক্ষ জোট থেকে প্রশ্ন উঠছিল—এই ‘প্ল্যান’-এর জবাব কি দেশবাসী ভোটের মাধ্যমে দেবে?
এলো ভোটের দিন—১২ ফেব্রুয়ারি। বিশেষ করে তাঁর জন্য দিনটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ১৫০টি কেন্দ্রের সবকটিতে জয় শুধু নয়, বিপুল সমর্থনে ২ লাখ ১৬ হাজার ২৮৪ ভোট পেয়ে তিনি পরাজিত করেন জোটের জামায়াত প্রার্থী, বগুড়া শাখার আমির আবিদুর রহমানকে। বগুড়া-৬ আসন—বগুড়ার ২১টি ওয়ার্ড ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত—সেখানেও বেসরকারিভাবে বিজয়ী হন প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে।
ঢাকাতেও নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রচারণায় তাঁকে শান্তিপ্রিয় প্রার্থী হিসেবে সাদরে গ্রহণ করা হয়েছে। তবে পথটি মসৃণ ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বক্তব্য, এমনকি প্রচারণার ছোট্ট অংশ নিয়েও এসেছে নানা উল্টাপাল্টা মন্তব্য। ‘খাম্বা’ ইমেজ জুড়ে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টাও হয়েছে। নির্দ্বিধায় বলা যায়, ঢাকা-১৭ আসনের বিজয় ছিল এ ধরনের নীচু মনমানসিকতার সমালোচনার বিরুদ্ধে এক উৎকৃষ্ট জবাব। এই আসনে তিনি পরাজিত করেন স ম খালিদুজ্জামানকে। বিএনপির চেয়ারপারসন এই আসনে পান ৭২ হাজার ৬৯৯ ভোট। পোস্টাল ভোটসহ ১২৫টি কেন্দ্রে গণনা শেষে ঢাকা-১৭ আসনের মানুষের ভালোবাসায় বিজয়ী হন তিনি।
প্রিয় নেতার দুই আসনের এই বিজয়কে সমর্থকেরা দেখছেন সর্বস্তরের মানুষের ভালোবাসার উপহার হিসেবে। এখনও দেশে অনেক মানুষ আছেন—যাঁরা ধানের শীষ নিয়ে সরাসরি রাজনীতি করেন না, কিন্তু শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্য নিরবে চোখের পানি ফেলেন। তাঁদের মতো দুই নেতার সন্তানের প্রতি অবহেলার ফল টক হতে পারে না—এমন বিশ্বাস সমর্থকদের। দেশের আগামীর অভিভাবক হিসেবে এই ‘সুমিষ্ট ফল’ কীভাবে তিনি মানুষের ভালোবাসায় নিজেকে বিলিয়ে দেবেন—সেই পথ এখন উন্মুক্ত।
“I have a plan”—এই উক্তি তাঁর নিজস্ব বক্তব্য। নিজের আসন ছাড়াও একটি দলের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি অংশ নেন প্রায় প্রতিটি নির্বাচনী জনসভায়। প্রচারণার শেষদিকে বিভিন্ন আসনের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে তাঁকে আপ্লুত ও উৎফুল্ল হতে দেখেছে দেশবাসী। বাসাবো মাঠের শেষ জনসভায় তাঁর আবেগ ছিল স্পষ্ট।
সেদিন ঢাকা-৮ ও ঢাকা-৯ আসনের প্রার্থীরা কাছ থেকে দেখেছেন—একজন সিনিয়রকে কীভাবে সম্মান দেখাতে হয়। জননেতা মির্জা আব্বাসের হাতে ধানের শীষ তুলে দিয়ে তিনি বলেন, “আজকে আমি এই এলাকার সন্তান, আপনাদেরই সন্তান। যে মানুষটির জন্ম এই এলাকায়, যে মানুষটির বেড়ে ওঠা এই এলাকায়, যে মানুষটি সব সময়, সব পরিস্থিতিতে এলাকার মানুষের ছিলেন—সেই মানুষটি মির্জা আব্বাস সাহেব।”
তিনি আরও বলেন, “১২ তারিখ আপনারা তাঁকে জিতিয়ে নিয়ে আসবেন। আগামী ১৩ তারিখ থেকে এই মানুষটি সারাজীবন, শেষ দিন পর্যন্ত আপনাদের পাশে থাকবে, এলাকার পাশে থাকবে ইনশাল্লাহ।”
ঢাকা-৯ আসনের প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিবের হাতেও আনুষ্ঠানিকভাবে ধানের শীষ তুলে দিয়ে তিনি বলেন, “এই হলেন হাবিব—আপনাদের এলাকার সন্তান, আমার ছোট ভাই। এই ছেলেটি সারাজীবন এই এলাকাতেই বড় হয়েছে। এই এলাকার মানুষের পাশে থেকেছে বিপদে-আপদে। এই এলাকায় যার বেড়ে ওঠা, এলাকার মানুষের সঙ্গে যার উঠাবসা—একমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব এই এলাকার উন্নয়ন করা। ১২ তারিখে হাবিব নির্বাচিত হলে ১৩ তারিখ থেকে এই ঢাকা-৯ এলাকার প্রতিটি মানুষকে দেখে রাখা, এলাকার উন্নয়ন দেখে রাখা—আর হাবিবকে আমি দেখে রাখব ইনশাল্লাহ, যেন এলাকার উন্নয়নে সে কাজ করে।”
দুটি গুরুত্বপূর্ণ আসনের প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া শুধু আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; হাজারো মানুষের উপস্থিত জনসভায় যেন এলাকাবাসীর সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতাও সম্পন্ন হয়।
অনেকে সবকিছুকে আবেগ বলে উড়িয়ে দিলেও মানুষের স্পৃহা আবেগ মানে না। দেশে বহু হাসপাতাল আছে—তবু কেউ যদি আরেকটি হাসপাতাল গড়ার কথা বলেন, তাতে আপত্তি কোথায়? উন্নয়নের প্রস্তাবকে কটাক্ষের চোখে দেখার আগে তার সম্ভাবনা বিচার করা কি উচিত নয়? একটি রাস্তায় যেমন একাধিক ওষুধের দোকান বা মুদির দোকান থাকতে পারে, তেমনি উন্নয়নের পরিকল্পনাও একাধিক হতে পারে। চিন্তার গভীরে না গিয়ে কটাক্ষকে জায়গা দিলে তা জনআকাঙ্ক্ষাকে আড়াল করে।
দেশ এবার সত্যিই উপলব্ধির সুযোগ পাবে। দেখতে পারবে—যিনি বলেছিলেন, “I have a plan”—তিনি আর কেউ নন; দেশের দুই প্রয়াত জনপ্রিয় অভিভাবকের সন্তান, তারেক রহমান।