জেন জি বিপ্লবঃ নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন ও পুরনো রাজনীতির প্রত্যাবর্তন

২০২৪ সালের গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই ঘটনার প্রায় আঠারো মাস পর দেশে অনুষ্ঠিত হলো বহুল আলোচিত জাতীয় নির্বাচন। অনেকেই এটিকে ‘জেন জি-প্রভাবিত’ নির্বাচন বলছেন, কারণ আন্দোলনের মূল শক্তি ছিল তরুণ প্রজন্ম। তবে ভোটের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, নেতৃত্বে এগিয়ে রয়েছে পুরনো রাজনৈতিক শক্তিগুলোই।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দেশজুড়ে তীব্র রূপ নেয়। আন্দোলনের সময় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। জাতিসংঘের হিসাবে, সহিংসতায় প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই তরুণ। ওই আন্দোলনের পর নতুন করে গণতান্ত্রিক পরিবেশে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জোরদার হয়।

এবারের নির্বাচনে প্রায় ৩৫ শতাংশ ভোটার ছিলেন নতুন ও তরুণ। অনেকেই প্রথমবার ভোট দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, আগের কয়েকটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতার তুলনায় এবারের ভোট তার কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় এবারের নির্বাচনে ঐতিহ্যগত দ্বিদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়নি। ফলে মাঠে শক্ত অবস্থান নেয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

৩০০ আসনের সংসদে বিএনপি কমপক্ষে ২০৯টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে এখন সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন।

অন্যদিকে, জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান পরাজয় স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।

আন্দোলনের সময় তরুণরা যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন, ভোটের ফলাফলে তার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেনি বলে অনেকের মত। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক তরুণ কর্মী বলেন, তারা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র কাঠামো প্রত্যাশা করেছিলেন, যেখানে লিঙ্গ, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সমান সুযোগ থাকবে।

বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়নি। দলটি নির্বাচনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ায় তরুণ ভোটারদের একাংশের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। বিশেষ করে জামায়াত কোনো নারী প্রার্থী না দেওয়ায় সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা দেখা যায়।

নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬০.৬৯ শতাংশ, যা গত এক দশকের তুলনায় বেশি বলে নির্বাচন কমিশন জানায়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন ভোটগ্রহণকে শান্তিপূর্ণ দাবি করে বলেন, অতীতের কেন্দ্র দখল বা ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা এড়াতে কমিশন সতর্ক ছিল।

BNP takes lead in Bangladesh election as vote counting continues

গুলশানের এক নারী ভোটার বলেন, এবারের ভোট তার কাছে আবেগের ও ক্ষমতায়নের অভিজ্ঞতা। তিনি আশা করেন, নতুন সরকার গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণ করা। দ্রুত সংস্কার, কর্মসংস্থান ও সুশাসনের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে না পারলে হতাশা বাড়তে পারে।

এছাড়া আঞ্চলিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে টানাপোড়েনে রয়েছে। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বেড়েছে। ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত আনার দাবি নিয়েও রাজনৈতিক আলোচনা চলছে। ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ।

এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে, তরুণ প্রজন্ম আন্দোলনের মাধ্যমে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। তবে নির্বাচনী রাজনীতির জটিল বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে সংগঠন, কৌশল ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

এখন প্রশ্ন একটাই—আন্দোলনের প্রেরণায় গড়া নতুন রাজনৈতিক চেতনা কি পুরনো কাঠামোর ভেতর থেকেই পরিবর্তন আনতে পারবে, নাকি আবারও আপসের রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে?

বাংলাদেশের নতুন অধ্যায় শুরু হলেও, এর সাফল্য নির্ভর করবে প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবে কত দ্রুত ও কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় তার ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *