বিজয় মজুমদার
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নানা কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসে আলোচিত হয়ে থাকবে। অন্তত বিগত তিনটি নির্বাচনে নির্বাচিত সরকার প্রায় কোনো প্রধান বিরোধী দলকে নির্বাচনে আনতে পারেনি, কারণ বিরোধী দলগুলো সরকারের অধীনে নির্বাচনে আস্থা রাখতে পারেনি। আর এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বিগত সরকারি দলকে ছাড়া।
তবে বাংলাদেশের অন্যান্য প্রায় সব রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। শুরুতে অনেকেই সে প্রতিশ্রুতির বিষয়ে সংশয়ে ছিলেন। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট শেষে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার এবং প্রায় সব পর্যবেক্ষক একবাক্যে মত দিয়েছেন—অন্তর্বর্তী সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে।
এই নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। অভিযোগ ছিল, ক্ষমতায় থাকাকালে একচেটিয়া ভোটের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষমতা স্থায়ী করার চেষ্টা তারা করেছিল, যার প্রেক্ষাপটে জুলাই বিপ্লব সংগঠিত হয়। দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত ভোটের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে দলটির সমর্থকদের একটি অংশ ভোটদানে নিরুৎসাহিত হয়। ফলে নির্বাচন নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হলেও ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
এই নির্বাচনে বিজয়ী দল হিসেবে আবার আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে এবার তাদের জয় সহজ ছিল না। বলা যায়, বিএনপির হাতে বিজয়ের ট্রফি তুলে দিতে পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছে তাদের প্রধান নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী দল জামায়াতে ইসলামী।
২০২৪ সালে রক্তাক্ত প্রতিবাদ-বিক্ষোভ সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিলে জামায়াতের মতো বিএনপির অনেক নেতাকর্মীও কারাগারে ছিলেন, অনেকে ছিলেন আত্মগোপনে। সে সময় দলের শীর্ষ নেতা তারেক রহমান ছিলেন লন্ডনে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ ওঠে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে জামায়াতপন্থীদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুতির পর জামায়াতে ইসলামী দ্রুত সংগঠন গুছিয়ে নিতে সক্ষম হয়। বিএনপির পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। এমনকি প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পরও দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে আগ্রহী অনেক নেতা নির্বাচনী মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। তাঁদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বহিষ্কৃত ও বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
সংসদ নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন নির্বাচনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হল সংসদ নির্বাচন ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব নির্বাচনে বিএনপির ছাত্রসংগঠনের ভরাডুবি ঘটে। বিপরীতে, জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। এতে জামায়াতের আত্মবিশ্বাস বাড়ে। আগে সংযত ভাষায় কথা বললেও পরে দলটির কিছু নেতা ও কর্মী স্বাধীনতার যুদ্ধকে অতীতে যেভাবে দেখতেন, সেই পুরোনো ব্যাখ্যায় তুলে ধরতে থাকেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ভোটারদের কাছে বিএনপি হয়ে ওঠে একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প।
নির্বাচনের আগে জামায়াত যে বড় ভুলটি করে, তা হলো নারীদের বিষয়ে তাদের বিভিন্ন মন্তব্য। কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার প্রস্তাব অনেক কর্মজীবী নারী ‘ফাঁদ’ হিসেবে দেখেন। তাঁদের ধারণা জন্মায়—ক্ষমতায় গেলে জামায়াত কর্মজীবী নারীদের গৃহবন্দী করে ফেলতে পারে। ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে দলটির নেতাদের বক্তব্য পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। পাশাপাশি জামায়াতের জোটে কোনো নারী প্রার্থী না থাকাও সমালোচনার জন্ম দেয়।
অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসও জামায়াতের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। অনেক নেতার বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত ছিল যেন নির্বাচনের আগেই তারা জয় নিশ্চিত ধরে নিয়েছেন। এতে সাধারণ ভোটারদের একাংশের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়—ক্ষমতায় গেলে দলটি ভিন্নমত সহ্য করবে কি না। যদিও জামায়াত একজন সংখ্যালঘু নেতাকে প্রার্থী করেছিল, তবু সংখ্যালঘু ভোটারদের আস্থা পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি।
অন্যদিকে বিএনপি অপেক্ষাকৃত সংযত অবস্থানে ছিল। যদিও তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ সামনে আসে, দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা অন্তত প্রকাশ্যে এ ধরনের অভিযোগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। তবে বিএনপিকে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় ফেলেছিল নিজেদের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। অনেকেই মনোনয়নপ্রত্যাশী হওয়ায় দলীয় ঐক্য বজায় রাখা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। দলটি একদিকে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বহিষ্কার করে, অন্যদিকে অনেককে পুনরায় দলে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়।
এই নির্বাচনে বিএনপি নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে সচেষ্ট হয়। তারা আশ্বাস দেয়—ক্ষমতায় গেলে ‘ভালো আওয়ামী লীগারদের’ বিরুদ্ধে প্রতিশোধপরায়ণ হবে না। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু ভোটারদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে যে তাঁদেরকে কোনো দলের ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে দেখা হবে না। মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলনও দেখা যায়।
সংখ্যালঘু ভোটারদের বড় অংশের কাছে এবার বিএনপির কার্যকর বিকল্প ছিল না। যারা ভোটকেন্দ্রে গিয়েছেন, তাঁদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিএনপিকেই বেছে নিয়েছেন। নারীদের ভোটে সমর্থন অর্জন ছিল বিএনপির বড় কৌশলগত সাফল্য। নির্বাচনী সময়ে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বক্তব্যে বিশেষ করে কর্মজীবী নারী ভোটাররা নিজেদের জন্য নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিএনপিকেই দেখেছেন।
নির্বাচনের আগেই একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল—ভোটার উপস্থিতি যত বেশি হবে, বিএনপির সম্ভাবনাও তত বাড়বে। যদিও শেষ মুহূর্তে টাকা-সহ এক জামায়াত নেতাকে আটক করার খবর দলটির ভাবমূর্তিতে আঘাত হানে।
সবশেষে, যারা ভোটকেন্দ্রে গিয়েছেন, তাঁদের বড় অংশ এমন একটি দলকে বেছে নিয়েছেন—যারা সংঘাত নয়, সহনশীলতার ভাষায় ভোটের রাজনীতি করতে চেয়েছে। সেই কারণেই এবার তারা বিজয়ী হয়েছে। এই নির্বাচন আগামী দিনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে থাকবে।