সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম: যিনি আলো জ্বালাতেন শব্দে

বিকেলের আলোটা আজ একটু অন্যরকম। মনে হচ্ছে সূর্যটা ঠিকমতো ডুবে যেতে পারছে না। কোথাও যেন একটা থমকে যাওয়া সময়, বাতাসও যেন চিনে নিচ্ছে কাকে হারিয়েছে আমরা।

সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম—নামটা বললেই একটা অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসত। ক্লাসরুমে তিনি ছিলেন আলো জ্বালানো মানুষ। বইয়ের পাতায় তিনি ছিলেন গল্পের জাদুকর। আর সমালোচনায়?—তিনি ছিলেন এমন এক আয়না, যেখানে সাহিত্য নিজেকে নতুন করে দেখতে পেত।

 এই তিনটি পরিচয়ের বাইরেও তিনি ছিলেন একজন গভীর প্রজ্ঞাবান মানুষ। তাঁর ক্লাসরুমে গেলে মনে হতো, জ্ঞান আর ভালোবাসা হাতে হাত রেখে হাঁটছে। তিনি পড়াতেন গল্প, কিন্তু আসলে শেখাতেন জীবনকে বোঝার কৌশল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ক্লাসরুমে তাঁর কণ্ঠ শুনে বহু প্রজন্মের শিক্ষার্থী শিখেছে, সাহিত্য শুধু বইয়ে থাকে না—এটা থাকে মানুষের চোখে, কথায়, দৃষ্টিতে, এমনকি নীরবতার মধ্যেও। তিনি বলতেন, “সাহিত্য মানে অন্যের যন্ত্রণা বুঝতে শেখা।”

তাঁর গদ্যে ছিল নরম আলো, তাঁর সমালোচনায় ছিল যুক্তির কোমলতা। তিনি কখনো কাউকে ছোট করেননি, কেবল আলো দেখিয়েছেন। বাংলাদেশের সাহিত্যের বুকে তিনি যেন ছিলেন এক নীরব প্রহরী—যিনি কথায় কথায় আমাদের ভেতরের অন্ধকারকে আলোকিত করে যেতেন।

আজ তিনি নেই। অথচ তাঁর কণ্ঠটা এখনো ভেসে আসে—
“লেখা মানে মানুষ হওয়া, মনে রেখো!”
শত শত ছাত্র, পাঠক, শ্রোতা—সবাই যেন আজ একটু নীরব। বইয়ের পাতা বন্ধ হচ্ছে, কিন্তু গল্প থেমে নেই। তাঁর ভাষা এখন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে, পাতা ঝরার শব্দের সঙ্গে মিশে গেছে।

আমি ভাবি, তিনি হয়তো এখন অন্য এক ক্লাসরুমে গেছেন—
যেখানে আলোর কোনো ছুটি নেই,
যেখানে রবীন্দ্রনাথ বসে আছেন জানালার পাশে,
নজরুল গুনগুন করছেন এক পুরোনো সুর,
আর সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম নিঃশব্দে বলছেন—
“চলো, গল্পটা এখান থেকেই শুরু করা যাক…”

মানুষ যখন চলে যায়, তখন পৃথিবী থেকে কিছু আলো কমে যায়।
আজ বাংলাদেশ হারিয়েছে এক শিক্ষক, এক সাহিত্য-সৈনিক,
যিনি কথায় কথায় আমাদের শেখাতেন—
ভালোবাসার মধ্যেই মানবতার শেষ আশ্রয়।

বিকেলের আলোটা এখন আরো মলিন।
তবু আমি জানি, কোথাও না কোথাও,
তিনি এখনও লিখছেন—
কোনো অদেখা খাতায়, নরম অক্ষরে,
আমাদের জন্য রেখে যাচ্ছেন
আরও একটি অসমাপ্ত গল্পের শুরু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *