মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কুকুর ও বিড়ালের মতো পোষা প্রাণী শুধু বন্ধু নয়, অনেক সময় মানসিক সান্ত্বনারও উৎস। কিন্তু এই ঘনিষ্ঠতার আড়ালে কখনো কখনো লুকিয়ে থাকতে পারে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। সম্প্রতি ৩০ বছরের এক তরুণীর অসুস্থতার ঘটনা সেটিই মনে করিয়ে দিল।
তিনি দিনের পর দিন অসহ্য পেটব্যথায় ভুগছিলেন। একাধিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন, করেছেন অসংখ্য ল্যাব টেস্ট। কিন্তু কোনো পরীক্ষাতেই ধরা পড়ছিল না ব্যথার কারণ। শেষমেশ সিটি (CT) স্ক্যান করার পর জানা যায়—তার পেটে একটি হাইডাটিড সিস্ট (Hydatid Cyst) তৈরি হয়েছে।
হাইডাটিড সিস্ট কী?
হাইডাটিড সিস্ট হলো একটি পরজীবী সংক্রমণ। এটি মূলত Echinococcus granulosus নামের কৃমির ডিম থেকে তৈরি হয়। শুরুতে শরীরে প্রবেশ করলেও কোনো উপসর্গ থাকে না। কিন্তু ধীরে ধীরে লিভার, ফুসফুস কিংবা পেটে সিস্ট তৈরি হতে থাকে।
সিস্ট বড় হলে দেখা দেয়:
- তীব্র পেটব্যথা
- বমি ও বমি বমি ভাব
- হজমে সমস্যা
- শ্বাসকষ্ট (যদি ফুসফুস আক্রান্ত হয়)
যদি চিকিৎসা না হয়, তা গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে এবং জীবনহানির ঝুঁকি পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়।
কিভাবে ছড়ায় এই রোগ?
হাইডাটিড রোগ মূলত ছড়ায় কুকুর ও অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণীর মাধ্যমে।
- কুকুর বা গরু-ছাগলের মলে থাকা কৃমির ডিম পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।
- দূষিত খাবার, পানি বা অপরিষ্কার হাতে খাবার খাওয়ার মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটে।
- যারা কুকুর বা অন্যান্য প্রাণীর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে থাকে এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা মানেন না, তাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
প্রতিরোধের উপায়
এই রোগ থেকে বাঁচতে কিছু সহজ নিয়ম মেনে চলা জরুরি—
- পোষা প্রাণীর নিয়মিত ডিওয়ার্মিং (কৃমিনাশক ওষুধ প্রয়োগ):
প্রতি কয়েক মাস পরপর পশু চিকিৎসকের পরামর্শে কুকুর-বিড়ালকে কৃমিনাশক ওষুধ দিন। - খাবারের স্বাস্থ্যবিধি মানা:
- সবসময় ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুয়ে খান।
- কাঁচা দুধ কখনো খাবেন না, সেদ্ধ করে পান করুন।
- অপরিষ্কার পানি না খেয়ে ফুটানো বা বিশুদ্ধ পানি পান করুন।
- হাত ধোয়া অভ্যাস করুন:
খাওয়ার আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পরে ভালোভাবে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া অভ্যাস করুন। - অপরিষ্কার পরিবেশ এড়িয়ে চলা:
যেখানে প্রাণীর মল পড়ে থাকে, সেসব জায়গা এড়িয়ে চলুন।
চিকিৎসা
হাইডাটিড সিস্ট ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। সংক্রমণের মাত্রা অনুযায়ী ওষুধ দেওয়া হয় বা অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সিস্ট অপসারণ করতে হয়।
হাইডাটিড সিস্ট এমন একটি রোগ, যা অনেক সময় বছরের পর বছর লুকিয়ে থাকে। একসময় মারাত্মক ব্যথা ও জটিলতায় আক্রান্ত করে। তাই হঠাৎ অজানা পেটব্যথা, হজমে সমস্যা বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত।
পোষা প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা অস্বাভাবিক নয়, বরং মানবিক। তবে সেই ভালোবাসা যেন না হয়ে দাঁড়ায় মৃত্যুঝুঁকির কারণ। সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি ও সতর্কতা অবলম্বন করলেই এই ভয়াবহ সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।