বাংলা সংগীতের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো। দেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ-এর গায়িকা, নন্দিত সঙ্গীতশিল্পী মাহবুবা রহমান ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।
পঞ্চাশ থেকে সত্তর দশক—এই দীর্ঘ সময়ে রেডিও ও সিনেমার গানে তাঁর কণ্ঠ ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। সহজ, আবেগী আর মাটির গন্ধমাখা গায়কি তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষ করে তোলে।
মাহবুবা রহমানের কণ্ঠে গাওয়া ‘মনের বনে দোলা লাগে’, ‘যাইয়ো না যাইয়ো না বন্ধুরে’, ‘ও বৈদেশী নাগর’, ‘আমার গলার হার খুলে নে ওগো ললিতে’, ‘আগুন জ্বালাইস না আমার গায়’, ‘আমার মন ভালো নাগো প্রাণ ভালো নাগো’ ও ‘আগে জানি নারে দয়াল’—এসব গান এখনও শ্রোতাদের মনে জায়গা করে আছে। বিশেষ করে সাত ভাই চম্পা ছবির ‘আগুন জ্বালাইস না আমার গায়’ গানটি একসময় তরুণদের মুখে মুখে ফিরত।
১৯৪৭ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিও ঢাকা কেন্দ্র থেকে তাঁর গান প্রথম প্রচারিত হয়। পরে ১৯৫৬ সালে মুখ ও মুখোশ চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের মাধ্যমে চলচ্চিত্রজগতে তাঁর পথচলা শুরু। তিনি আরও গান গেয়েছেন জাগো হুয়া সাভেরা, আসিয়া, যে নদী মরুপথে, সূর্যস্নান, সোনার কাজল, রাজা সন্ন্যাসী, নবাব সিরাজউদ্দৌলা-সহ বহু চলচ্চিত্রে।
মাহবুবা রহমানের প্রকৃত নাম ছিল নিভা রানী রায়। ১৯৩৫ সালে চট্টগ্রাম-এ তাঁর জন্ম। শৈশবেই পরিবারসহ ঢাকা-য় চলে আসেন। সংগীতে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠে সে সময়ই। তিনি সুধীরলাল চক্রবর্তী, ওস্তাদ পিসি গোমেজ ও মোমতাজ আলী খানের কাছে সংগীত শেখেন। গীত ও গজল শিখেছেন ওস্তাদ কাদের জামেরী ও ওস্তাদ ইউসুফ কোরেশীর কাছে।
১৯৪৮ সালে ঢাকার কামরুননেসা গার্লস স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করার পর তিনি আর পড়াশোনা এগিয়ে নেননি। খুব অল্প বয়সেই সংগীতকে জীবনের একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নেন।
১৯৫৮ সালে তিনি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব খান আতাউর রহমান-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের সংসারে দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। স্বনামধন্য সংগীতশিল্পী রুমানা ইসলাম তাঁর কন্যা।
জীবনের পরবর্তী সময়ে তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে আড়ালে নিয়ে যান। রাজধানীর মগবাজারের বাসায় নিভৃত জীবনযাপন করছিলেন এই শিল্পী। চলতি মাসের ৩ মার্চ তিনি ৯২ বছরে পা রাখেন। জন্মমাসেই তাঁর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটল।
মাহবুবা রহমান শুধু একজন গায়িকা নন, বাংলা সংগীতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাঁর কণ্ঠে ধরা পড়েছে সময়, সমাজ আর মানুষের অনুভূতি। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সংগীতাঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হলো।