শীতের প্রথম ভারী বৃষ্টি যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় আরেকটি অদৃশ্য হামলা হয়ে নেমে এসেছে। দুই বছরের অবিরাম সংঘাত, অবরোধ, ক্ষুধা আর রোগের সঙ্গে লড়াই করতে থাকা মানুষের মাথার ওপরে ছিল কেবল পাতলা কাপড়ের একটিমাত্র আশ্রয়। সেই আশ্রয়ই এখন বৃষ্টিতে ভিজে ভেঙে পড়ছে।
বৃষ্টি নেমেছিল হঠাৎ করেই। মিনিটের মধ্যে বহু তাবু ছিঁড়ে যায়, পুরোনো কাপড় ভিজে লেপ্টে যায় কাদায়। চোখের সামনে আশ্রয় ভেঙে যেতে দেখে শিশুরা ঘাবড়ে ওঠে। কিছু শিশু কাদায় পা আটকে ফেলেছিল, কিছু মা শেষ সামান্য বিছানাপত্রটা বাঁচাতে ঝড়ের ভেতর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
সেই মুহূর্তগুলো গাজার শিবিরগুলোতে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে — আশ্রয় আর নেই, শীত ঠেকানোর কোনও ব্যবস্থা নেই, আর ভরসা করারও কেউ নেই।
বৃষ্টি থামার পর যে দৃশ্য দেখা গেল, তা যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মতোই বিধ্বংসী। কেউ সংগ্রহ করছে পাথর আর বালুর বস্তা, যাতে শোয়ার জায়গাটা কিছুটা উঁচু করা যায়। কেউ ছুটছে কোনও শুকনো কোণা খুঁজে পাওয়ার আশায়। কেউ আবার নিজের তাবুতে জমে থাকা পানি বালতিতে ভরে বাইরে ফেলছে—জানে, বৃষ্টি আবার আসবে, কিন্তু আজ তাকে অন্তত ঘুমাতে হবে।
গাজার সরকারি গণমাধ্যম দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ১ লাখ ৩৫ হাজার তাবুর ৯৩ শতাংশই এখন সম্পূর্ণ অযোগ্য। প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার তাবু মানুষ বসবাস করার মতো অবস্থায় নেই। সেই তাবুতেই পরিবারের কয়েকজন একসঙ্গে গাদাগাদি করে রাতে থাকেন।
যুদ্ধের ভয়াবহতা যতটা দৃশ্যমান, বর্ষার দুর্দশা ততটাই অদৃশ্য কিন্তু গভীর।
শরণার্থীদের মুক্ত চলাচলেও রয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। যে “হলুদ রেখা”র কথা মানুষ এখন ভয় পায় — সেটি আসলে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে ইসরায়েলি সেনাদের পিছু হটার সীমা। এই রেখা দুই ভাগে ভাগ করেছে গাজা: পূর্বের ধ্বংসস্তূপে পরিণত পুরোনো এলাকা, আর পশ্চিমের সংকীর্ণ চলাচলের অনুমতিপ্রাপ্ত অঞ্চল। মানুষ সেই রেখার কাছে গেলেই লক্ষ্য করা হয়। রেখা পার না হলেও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটছে। তাই বৃষ্টিতে তাবু ভিজলেও, কেউ রেখার ওপারে গিয়ে অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিতে পারে না।
এই সীমাবদ্ধতাই বৃষ্টিকে সেখানে এক নতুন শত্রুতে পরিণত করেছে।
গাজায় এখন সবচেয়ে বড় সংকট—
- নিরাপদ পানি
- খাবার
- চিকিৎসা
- আর আশ্রয়
যারা তাবু হারিয়েছে, তারা খোলা জায়গায় রাত কাটাচ্ছে। অনেক পরিবার জানান, বৃষ্টির পর রাতগুলো আরও ভয়ংকর। ঠান্ডা বাতাসে ভিজে থাকা শিশুদের ঠান্ডা-জ্বর বেড়ে যাচ্ছে, অনেক প্রাপ্তবয়স্কও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
গাজার কর্তৃপক্ষ বলছে, দুই বছরের যুদ্ধের ওপর বর্ষার এই নতুন আঘাত দুর্দশাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এক মা বলছিলেন, “আমার শিশুকে ভেতরে নেওয়ার মতো শুকনো জায়গাই নেই। রাতে ওকে জড়িয়ে ধরে রাখলাম, ভেজা কাপড়ের গন্ধ আর ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ঘুমিয়ে পড়েছে।”
মানবিক সাহায্য গাজায় প্রবেশ করতে পারছে খুবই সীমিতভাবে। নতুন তাবু, কম্বল, গরম কাপড়, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা—এসবের কোনওটাই যথেষ্ট পরিমাণে পৌঁছাতে পারছে না।
তাই মানুষ নিজেরাই ছোট ছোট ভাঙা কাঠ, ইট, বস্তা দিয়ে নিজেদের নতুন “আশ্রয়” নির্মাণ করছে। এগুলো আশ্রয় নয়—এগুলো বেঁচে থাকার জেদ।
গাজার মানুষ দুই বছর ধরে যুদ্ধের তীব্রতা সহ্য করেছে। ঘর হারিয়েছে, জমি হারিয়েছে, পরিবার হারিয়েছে। কিন্তু এ বছর শীত তাদের সামনে এনে দিয়েছে আরেকটি ভয়: তাবু ভেঙে পড়ার ভয়, বৃষ্টির কাদায় শিশুর অসুস্থ হওয়ার ভয়, খাবার কমে যাওয়ার ভয় এবং প্রতিদিনের বেঁচে থাকার ভয়।
বর্ষা যেন গাজার প্রতিটি তাবুর ভিতর একই প্রশ্ন রেখে গেছে— “আগামীকাল তুমি কোথায় ঘুমাবে?”