মারুফ আহমেদ
ঢাকায় ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালার টানাপোড়েন বহুদিনের। এতদিন তা নীরবে চললেও সাম্প্রতিক সময়ে নেটমাধ্যমে চলমান আলোচনা-সমালোচনা এটিকে প্রকাশ্য বিরোধে রূপ দিয়েছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন—কোনো দিন ভাড়াটিয়াদের পিঠ দেয়ালে ঠেকলে প্রতিবাদের ময়দানে নেমে আসা অস্বাভাবিক হবে না।
প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও এই ইস্যু নিয়ে কথা কাটাকাটি চলছে। অনেক জায়গায় সরকারি কর্মকর্তা দুই পক্ষকে নিয়ে বসছেন। চিৎকার–চেঁচামেচিতে সমাধান মিলছে না; বরং বেরিয়ে আসছে বহু বছরের জমে থাকা অভিযোগ। বিশেষ করে ২০–৩০–৩৫ বছরের পুরোনো ভাড়াটিয়ারা অভিযোগ করছেন—দীর্ঘদিন একই বাসায় থাকলেও বাড়িওয়ালার কাছ থেকে সামান্যতম মানবিকতা পান না তাঁরা। ভাড়াটিয়ারা তাঁদের ‘নিষ্ঠুর বাড়িওয়ালা’ বললেও, অধিকাংশ বাড়িওয়ালার প্রত্যুত্তর একটাই—“এদের সঙ্গে আমাদের শুধু ভাড়ার সম্পর্ক।”
ডিএনসিসির সাম্প্রতিক এক বৈঠকে এক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, “বাড়িওয়ালারা এই শহরের জমিদার, আর আমরা প্রজা। আমাদের কষ্টের টাকায় ভাড়া দিলেও তাঁরা আমাদের মানুষ বলে মনে করেন না।” তাঁর আরও অভিযোগ—ভাড়ার টাকায় বাড়িওয়ালার সংসার চলে, পরিবারের সব চাহিদা মেটানো হয়; অথচ ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে আচরণে থাকে অবহেলার ছাপ।
ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া না–দেওয়ার প্রবণতাও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাকরি কিংবা পড়াশোনার জন্য শহরে আসা তরুণ–তরুণীরা বোর্ডিং বা মেস না–পেলে কোথায় থাকবে, সে প্রশ্নও ওঠে। অনেকে মনে করেন—প্রতিটি বাড়িতে অন্তত ১০ শতাংশ জায়গা ব্যাচেলর ভাড়াটিয়াদের জন্য বরাদ্দ রাখা উচিত।
নিরপেক্ষ মহল বলছেন, ভাড়াটিয়া দীর্ঘদিন থাকুক বা অল্প সময়—মানবিক আচরণই সুসম্পর্কের ভিত্তি। নতুন বাড়ির ক্ষেত্রে জমির মূল্যের ১৫ শতাংশ হারে ভাড়া নির্ধারণ যুক্তিযুক্ত হলেও, ৩০–৪০ বছরের পুরোনো ও ভেতরের এলাকার বাড়িগুলোর ভাড়া আরও কম হওয়া দরকার। কিন্তু ঢাকার ছবি ঠিক উল্টো। নতুন–পুরোনো, বড় রাস্তা–চিপা গলি—কোথাও ভাড়ায় তেমন পার্থক্য নেই। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে বৈষম্যহীন এক দোলাচল।
ভাড়ানিয়ন্ত্রণ আইনেও অসঙ্গতি দেখা যায়। বাড়িওয়ালা অধ্যাদেশের ১৬ ধারায় বলা আছে—বাড়ির বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া ২০ বছরের মধ্যে ভাড়া বাড়ানো যাবে না। বাস্তবে চলছে তার উল্টোই । প্রতি বছরই ভাড়া বাড়ছে, একজন ভাড়াটিয়া বাসা ছাড়লে নতুন ভাড়াটিয়ার ক্ষেত্রে ভাড়া আরও বেশি করা হচ্ছে। নতুন বছর ঘিরেও চলে বাড়তি চাপ—“জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, জানুয়ারি থেকে ভাড়া বাড়বে”—এমন ঘোষণা অনেক ভাড়াটিয়াকে বাসা ছাড়তে বাধ্য করে।
৩০ দিনের নোটিশে বাসা ছাড়তে বলাটা ভাড়াটিয়াদের জন্য বাড়তি দুর্ভোগ। চাকরি ও পরিবারের ব্যস্ততার মাঝে নতুন বাসা খুঁজে পাওয়া অনেকের জন্যই কঠিন। এ ছাড়া বড় অঙ্কের অগ্রিম ভাড়া নেওয়ার প্রবণতাও এখন বাড়ছে, যা ভাড়ানিয়ন্ত্রণ আইনের সঙ্গে বেমানান। দেশে আইন থাকলেও বাড়িওয়ালারা তা কখনোই মানেন না।
এই পরিস্থিতিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। অনেকেই একে ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে মনে করছেন। ২৭ নভেম্বর নগরভবনের এক গোলটেবিল বৈঠকে উত্তর সিটির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, “১৯৯১ সালের ভাড়ানিয়ন্ত্রণ আইন কেউ মানছে না। আমরা ডিসেম্বরের মধ্যে আইন অনুযায়ী ভাড়াটিয়া–বাড়িওয়ালার জন্য নির্দেশিকা তৈরি করব। ভাড়াটিয়ারা নিজের ঘরে নিশ্চিন্তে প্রবেশ–বাহির হতে পারবেন। বাড়িওয়ালাকে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, ভূমিকম্পসহনীয় কমপ্লায়েন্স মানতে হবে। হোল্ডিং ট্যাক্স না দিলে সংশ্লিষ্ট বাড়িকে কোনো সেবা দেওয়া হবে না। দুই পক্ষের জন্য একটি চুক্তিপত্রের নমুনা ওয়েবসাইটে দেওয়া হবে। আবাসিকে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করা হবে। এলাকাভিত্তিক সর্বোচ্চ ভাড়া–সীমা নির্ধারণ করে ‘রেট কার্ড’ তৈরি করা হবে। আর বাড়িওয়ালার হোল্ডিং ট্যাক্স সম্পর্কেও ভাড়াটিয়ারা জানবেন।”
তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ভাড়াটিয়ারা মনে করেন—শুধু উত্তর সিটিতে সমাধান দিলে হবে না। দক্ষিণ সিটির বাসিন্দারা দীর্ঘদিন অবহেলিত। তাঁদের ভাড়াটিয়া–বাড়িওয়ালার টানাপোড়েন আরও তীব্র, যা প্রায় প্রতিদিনই প্রকাশ পাচ্ছে।
নগরপরিচালনার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁদের কাছে আবেদন—উত্তর–দক্ষিণ উভয় সিটির সমস্যা সমান গুরুত্বে বিবেচনা করা হোক। এক সিটির উন্নয়ন আরেক সিটির বাসিন্দাদের জন্য বৈষম্য না তৈরি করলেই সমাধান হবে দীর্ঘদিনের এই নীরব লড়াই।