মারুফ আহমেদ
সারা দেশেই একই চিত্র—ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা। কার্যত পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণহীন এই বাস্তবতায় মৃত্যুর মিছিল ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’—এই দাবিটি বহুদিনের হলেও, তা বাস্তবায়নে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে কোনো সুপরিকল্পিত ও কার্যকর দিকনির্দেশনা দেখা যাচ্ছে না।
ফলে দিন দিন বাড়ছে সড়কে মৃত্যুঝুঁকি। নিরাপদ যাত্রা—এই ধারণাটিই যেন এখন সড়ক থেকে উধাও। পরিবহন মালিকরা যেখানে নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থে সবচেয়ে বেশি মনোযোগী, সেখানে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তেমন কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। অন্যদিকে প্রশাসনও যেন অনিয়ন্ত্রিত সব ধরনের বাহনের দাপুটে স্টিয়ারিংয়ের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে।
সড়কের যাত্রীসেবা ও যাত্রী পারাপারে নেই কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলা। সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ বাস্তবায়নে কার্যত অচলাবস্থা বিরাজ করছে। সড়ক পরিবহন বিধিমালা ২০২২ সরকারি পর্যায়ে প্রচলিত হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই। আইন-বিধি যেন কাগজেই সীমাবদ্ধ। কেউ কিছুই পরোয়া করছে না।
২০২৫ সালের শেষ দিনটিও রেহাই পায়নি সড়কের রক্তক্ষয় থেকে। খিলগাঁও–বাসাবো উড়ালসড়কে একটি কাভার্ড ভ্যানের নিচে চাপা পড়ে যান এক পুলিশ সদস্য, যিনি মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন। বিস্ময়ের এখানেই শেষ নয়। বছরের শেষ রাত পেরোতেই, পরদিন সকালে মৌচাক–মালিবাগ উড়ালসড়কে মোটরসাইকেল ও সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীসহ প্রাণ হারান দু’জন।
সাধারণ নাগরিক ও যাত্রীদের অভিযোগের বড় অংশই তিন চাকার বাহন, বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ঘিরে। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের উচ্চগতির মোটরসাইকেল চালানোকে সড়কের সবচেয়ে জঘন্য সংস্কৃতি হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন পথচারীরা। অনেকেই এই প্রবণতাকে ‘অতি আদরে নষ্ট সন্তান’ তৈরির ফল বলেও কটুকথা বলতে দ্বিধা করছেন না। কেউ কেউ তো সন্তানকে দামি মোটরসাইকেল উপহার দেওয়াকে নিজের হাতেই মৃত্যুর চাবি তুলে দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করছেন।
পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তুলে ধরছে। দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ব্যক্তিগত বাহন হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হচ্ছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। গেল বছরে দেশে ঘটেছে ২ হাজার ৬৯৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। ২০২৫ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২ হাজার ৪৪৮ জন। গড়ে দেখা যাচ্ছে, সড়কে প্রতি পাঁচজন মৃত্যুর মধ্যে প্রায় দুইজনের মৃত্যু হচ্ছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। এসব ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চালকের তাৎক্ষণিক মৃত্যু একটি পরিবারের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় হয়ে দেখা দিচ্ছে।
গবেষকরা যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা লেন করার সুপারিশ করলেও বাস্তবে তার কোনো ফল পাওয়া যায়নি। বিশ্লেষকরা সরাসরি বিআরটিএকে দায়ী করছেন। প্রশ্ন উঠছে—এত প্রাণহানি ঘটার পরও কীভাবে অযোগ্য ও অকৃতকার্য চালকেরা মোটরসাইকেলের লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছেন? ভেতরের দালালচক্র ও অসাধু কর্মকর্তাদের লাইসেন্স বাণিজ্য বন্ধ না হলে সড়ক দুর্ঘটনা যেমন থামবে না, তেমনি কমবে না প্রাণহানির হারও।
বিগত বছরে সড়ক দুর্ঘটনার হিসাব যেন সীমা ছাড়িয়েছে। মহাসড়ক থেকে শুরু করে অলি-গলিও আর নিরাপদ নয়। মানুষের তুলনায় বাহনের সংখ্যা যেন দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এর চরম খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। দেশের প্রতিটি সড়ক ও মহাসড়কে এখন অবধারিত মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে।
বিআরটির হিসাবে, ২০২৫ সালে নভেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫ হাজার ১৬ জন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৯৮১ জন। ২০২৪–২০২৫ সময়ে মোট সড়ক মৃত্যুর হিসাব দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৪২০ জনে, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। যারা ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে গেছেন, তাঁদের আহত হওয়ার সংখ্যাও কম নয়। গত ১২ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন প্রায় ১২ হাজার ৫২৮ জন, আর একই সময়ে মোট দুর্ঘটনার সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার ৪৩৭টি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২২ সালের পর থেকেই দেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা পুরোপুরি বেসামাল হয়ে পড়েছে। একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে, প্রাণহানি অব্যাহত। ২০২৫ সালে এমন কোনো দিন, সপ্তাহ বা মাস নেই—যা সড়ক দুর্ঘটনা ছাড়া কেটেছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে মৃত্যুর সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা ভাবতেই শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ মহল সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে চারটি বিষয় চিহ্নিত করছেন—
১. দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা
২. বেপরোয়া গতি ও প্রতিযোগিতামূলক চালনা
৩. চালকের অদক্ষতা, অপেশাদিত্ব ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা
৪. ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন
যাত্রী ও পথচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের ব্যস্ত সড়কগুলোতে অধিকাংশ চালকই কাউকে তোয়াক্কা না করেই গাড়ি চালাচ্ছেন। পথচারীদের প্রতি রয়েছে চরম উদাসীনতা। ফলে নিজের জীবনের নিরাপত্তা যেন সবাইকে নিজ নিজ বুকপকেটেই বহন করে প্রতিদিন রাস্তায় নামতে হচ্ছে। দেশের ব্যস্ত সড়কগুলোতে সাধারণ মানুষের জীবন আজ চরম বিপন্ন।
যদিও সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে মাসিক সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে, তবে দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ এখনো চোখে পড়ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুটপাত থেকে অবৈধ দখলদার ও ব্যবসা উচ্ছেদ করে সড়ক প্রশস্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে অদক্ষ চালকদের লাইসেন্স বাতিল এবং ফিটনেসবিহীন প্রায় সাত লাখ যানবাহন ব্যস্ত সড়ক থেকে অপসারণ করা এখন সময়ের দাবি।
সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মনে একটি বড় প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে—২০২৫ সালে হালনাগাদ তথ্যে সড়কে ছয় হাজারের বেশি তাজা প্রাণ ঝরে গেল, এর দায় কে নেবে?
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, দেশের সড়কে বিদ্যমান নিরাপত্তা অবকাঠামো পুরোপুরি ভঙ্গুর। নাগরিক সুরক্ষা দিতে এটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ। তাই সড়ক দুর্ঘটনাকে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। এটি এখন ভয়াবহ এক জাতীয় সংকট—যা উপেক্ষা করার সুযোগ সরকারের আর নেই।
লেখক: সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক