দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বেগমকে ঐক্যবদ্ধ করে ঢাকায় ভারতের ‘র’-এর গোপন ভূমিকা

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই ভারতের বহিঃবিশ্ব বিষয়ক গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (RAW) বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব বিস্তার করে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদন ও গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ১৯৯০-এর দশকে সামরিক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে RAW গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে, তৎকালীন দুই প্রতিদ্বন্দ্বী নেত্রী — শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়াকে এক মঞ্চে আনতে ভারতীয় গোয়েন্দাদের কৌশলী হস্তক্ষেপ ছিল নির্ণায়ক ।

১৯৮০-এর শেষ দিকে বাংলাদেশে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন তীব্র হয়। এই পরিস্থিতিতে RAW সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের লক্ষ্য ছিল — এরশাদ সরকারের পতন ঘটিয়ে একটি গণতান্ত্রিক ও ভারত-অনুকূল সরকার প্রতিষ্ঠা করা। এই উদ্দেশ্যে তারা বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করে।

যদিও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ ছিল, RAW গোপন বৈঠকের মাধ্যমে দুই নেত্রীর মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা করে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঐক্য গঠনে RAW-এর ভূমিকা ছিল কৌশলী ও পরিকল্পিত — যাতে সামরিক শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে ঢাকা নমনীয় নীতি গ্রহন করে ।

RAW শুধু রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টাই করেনি, তারা গণআন্দোলনকে সংগঠিত করতেও গোপন সহায়তা দেয়। সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, RAW এরশাদবিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখে এবং আন্দোলনের রূপরেখা তৈরিতে সহায়তা করে। এমনকি, কিছু ক্ষেত্রে আন্দোলনকারীদের আর্থিক ও কৌশলগত পরামর্শও দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায় ।

১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হলেও, RAW-এর প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে কমেনি। পরবর্তীতে ২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার বিজয়েও RAW-এর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত বাংলাদেশে এমন একটি সরকার চেয়েছে যা তাদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ।

যদিও RAW-এর এই হস্তক্ষেপ ভারতের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর হয়েছে, তবুও এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলেছে। অনেকেই মনে করেন, এই ধরনের গোপন হস্তক্ষেপ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল — যা দীর্ঘমেয়াদে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে অনাস্থা তৈরি করে ।

আজ, যখন বাংলাদেশে “India Out” আন্দোলন জোরালো হচ্ছে, তখন এই প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে — কোনও বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এত গভীর হস্তক্ষেপ কি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য স্বাস্থ্যকর? উত্তর হয়তো জটিল, তবে ইতিহাস বলে, ১৯৯০-এর সামরিক পতনের পেছনে RAW-এর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *