বসের সঙ্গে সম্পর্কে কতটা ঝুঁকিতে ক্যারিয়ার

“ভালোবাসায় ক্ষতি কী?”—এই প্রশ্ন উঠতেই পারে, যখন কোনো কর্মী তার বসের সঙ্গে প্রেমে জড়ান। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই সম্পর্ক হৃদয়ের চেয়ে অনেক বেশি কিছুতে আঘাত হানতে পারে—বিশেষ করে আয়ে ও ক্যারিয়ারে। প্রভাবশালী অর্থনৈতিক সাময়িকী The Economist গত নভেম্বরে প্রকাশিত “The costs of dating your boss” প্রতিবেদনে ফিনল্যান্ডের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণ করে এমনই এক বাস্তবতা তুলে ধরেছে।

গবেষণায় দেখা যায়, কোনো কর্মী যখন তার সরাসরি সুপারভাইজারের সঙ্গে গুরুতর সম্পর্কে জড়ান, প্রথম দুই বছরে তার আয় গড়ে প্রায় ৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে এই সুবিধা স্থায়ী নয়। সম্পর্ক ভাঙার পর আয় গড়ে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়, এবং এই নেতিবাচক প্রভাব চার বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে কর্মীরা চাকরি বদল করতে বাধ্য হন, কেউ কেউ সাময়িকভাবে কর্মজীবন থেকেও ছিটকে পড়েন।

এই ধরনের সম্পর্কে ক্ষমতার ভারসাম্য সাধারণত সমান থাকে না। গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারী কর্মীরা পুরুষ ম্যানেজারের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান এবং সম্পর্ক ভাঙার পর ক্ষতির মাত্রাও নারীদের ক্ষেত্রেই বেশি। অন্যদিকে, পুরুষ কর্মীরা যদি নারী বসের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান, তাহলে আয় বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে বেশি—গড়ে প্রায় ১২ শতাংশ। তবে বিচ্ছেদের পর ক্ষতির ধরণ দুই ক্ষেত্রেই প্রায় সমান।

এই সম্পর্কের প্রভাব কেবল দুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। গবেষণা বলছে, এমন সম্পর্ক শুরু হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অন্যান্য কর্মীদের ধরে রাখার হার প্রায় ৬ শতাংশ কমে যায়। অনেক কর্মীর কাছে এটি ‘অন্যায় সুবিধা’ হিসেবে ধরা পড়ে, যা কর্মপরিবেশে আস্থা ও ন্যায্যতার সংকট তৈরি করে।

এই কারণেই বিশ্বজুড়ে বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বস–কর্মী সম্পর্কের বিষয়ে কঠোর নীতিমালা গ্রহণ করেছে। ম্যাকডোনাল্ডসের মতো প্রতিষ্ঠানে এমন সম্পর্ক বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ করতে হয়। ২০১৯ সালে এই নীতিমালা লঙ্ঘনের কারণেই তৎকালীন সিইও স্টিভ ইস্টারবুককে পদ হারাতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালোবাসা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কিন্তু ক্ষমতার অসমতা থেকে আসা ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা সম্ভব। স্বচ্ছ নীতিমালা, পেশাদার সীমারেখা এবং সম্পর্ক ভাঙনের পর কর্মীদের জন্য সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা—এসবই প্রতিষ্ঠান ও কর্মী উভয়ের জন্য জরুরি।

ভালোবাসা আকর্ষণীয় হতে পারে। কিন্তু যখন তা ক্ষমতার অসম সম্পর্কের ভেতরে জন্ম নেয়, তখন ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত নয়—আয়, ক্যারিয়ার এবং পুরো প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যও প্রশ্নের মুখে পড়ে। The Economist–এর এই গবেষণা মনে করিয়ে দেয়, অফিসে প্রেম করতে গেলে আবেগের পাশাপাশি হিসাবও জরুরি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *