ক্ষমতা ও প্রতিরোধের রাজনীতি: বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ পথচলা

মো: সাব্বির হোসেন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ, প্রভাবশালী ও বহুল আলোচিত নাম। তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রী নন; দীর্ঘ সময় ধরে দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ক্ষমতার পালাবদল এবং রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবেই পরিচিত। একজন নারী রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁর উত্থান ও নেতৃত্ব বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে জিয়াউর রহমান সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলে তাঁর পরিবার চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে। বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, সে সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বেগম খালেদা জিয়াকে মানসিক চাপ ও নজরদারির মধ্যে রাখে এবং একপর্যায়ে তাঁকে গৃহবন্দি অবস্থায় থাকতে হয়। স্বামীর জীবন অনিশ্চিত থাকা সত্ত্বেও তিনি মানসিক দৃঢ়তা বজায় রেখে পরিবারকে আগলে রাখেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন অসংখ্য নারীর ত্যাগ ও সংগ্রামের একটি প্রতিচ্ছবি এই অভিজ্ঞতা।

১৯৮১ সালে শহীদ জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বেগম খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত।

১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন ঘটে—যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। তিনি বিশ্বের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও ইতিহাসে স্থান করে নেন।

১৯৯৬ সালে তিনি দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন। তবে প্রবল রাজনৈতিক আন্দোলনের মুখে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে মাত্র ১২ দিন—(১৯ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ) পর্যন্ত—দায়িত্ব পালন করে তিনি পদত্যাগ করেন।

২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়া তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। এই মেয়াদে অর্থনীতি, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা ও সামাজিক খাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও পরিলক্ষিত হয়।

তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর নেতৃত্বে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি ঘটে। বিশেষ করে একজন নারী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর অবস্থান অনেক নারীকে রাজনীতি ও নেতৃত্বে আগ্রহী করেছে—যা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অবদান।

তবে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। তাঁর শাসনামলে দুর্নীতি, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে আপসহীন অবস্থানের অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয় নিয়ে সমাজে নানা মত ও বিশ্লেষণ রয়েছে, যা ইতিহাসের অংশ হিসেবেই বিবেচিত হবে।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিল করুণ ও আলোচিত। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দীর্ঘ কারাবাস, মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার মধ্য দিয়েই জীবনের শেষ সময় কাটে বেগম খালেদা জিয়ার। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ হিসেবে জীবদ্দশায় তাঁর প্রতি ন্যায়বিচার, মানবিক আচরণ ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রশ্ন বারবার সামনে এসেছে। রাজনৈতিক মতভেদ সত্ত্বেও এই অধ্যায়টি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক সহনশীলতা নিয়ে গভীর আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়।

সবশেষে বলা যায়, বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। তাঁর সাফল্য, ব্যর্থতা, বিতর্ক ও অবদান—সব মিলিয়েই তিনি ইতিহাসের অংশ। তাঁকে নিয়ে ভাবনা একমাত্রিক না হয়ে বিশ্লেষণধর্মী ও ভারসাম্যপূর্ণ হওয়াই ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য অধিক শিক্ষণীয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *