পার্বত্য চট্টগ্রামে সোলার-চালিত ক্লাসরুমে শিশুদের নতুন বিশ্ব

দীর্ঘ নৌকাভ্রমণ, তারপর বাঁশের ভেলা, শেষে পাহাড়ি পথে কয়েক ঘণ্টা হাঁটা—এই কঠিন যাত্রার পর এক বিশাল বাক্স পৌঁছাল রাঙামাটির দুর্গম এক স্কুলে। বাক্সের ভেতরে ছিল এমন কিছু, যা শিশুরা কেবল গল্পে শুনেছে, কিন্তু কখনও চোখে দেখেনি—একটি “বড় টিভি”, যা সূর্যালোকে চলে!

পর্দায় প্রথম ছবি ফুটে উঠতেই ক্লাসরুম ভরে গেল অবাক বিস্ময়ে। শিশুরা এগিয়ে এল, চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক। এই মুহূর্তটি তাদের কাছে ছিল যাদুর মতো। পার্বত্য চট্টগ্রামের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে সূর্যশক্তিচালিত মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম (এমএমসি) এখন নতুন বিশ্বের দ্বার খুলে দিচ্ছে।

রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ইতিমধ্যে ৫৭০টি সোলার-চালিত ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), চট্টগ্রাম পার্বত্য জেলা পরিষদ ও কানাডিয়ান হাই কমিশনের যৌথ উদ্যোগে ‘ইকোসিস্টেম রেস্টোরেশন অ্যান্ড রেসিলিয়েন্ট ডেভেলপমেন্ট ইন সিএইচটি (ERRD-CHT)’ প্রকল্পের অধীনে এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো। শুধু সাধারণ বিদ্যালয় নয়, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও শিশুদের প্রতিবন্ধী স্কুলগুলোও এর সুফল পাচ্ছে।

বইয়ের পাতা থেকে পর্দায় জীবন্ত পাখি
ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী ময়নার কথায়, “আগে পাখির নাম শুধু বইতে পড়তাম, এখন আকাশে উড়ে যেতে দেখি!” ভূগোলের ক্লাসে স্থির মানচিত্রের বদলে এখন নদী, পাহাড় ও সীমান্ত উঁকি দিচ্ছে জীবন্ত রূপে। একজন শিক্ষক জানালেন, “ছাত্রছাত্রীরা বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, প্রশ্ন করছে, স্কুলে অনুপস্থিতি কমেছে।”

মায়ের স্বপ্ন, মেয়ের ভবিষ্যৎ
বান্দরবানের রোকেয়া বেগমের মেয়ে এখন বাড়ি ফিরে গল্প করে গ্রহ-নক্ষত্র ও কম্পিউটারের কথা। “আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ আমার চেয়ে উজ্জ্বল হবে—এই আশা এখন আরও জোরালো,” বললেন তিনি।

প্রথম ধাপে ১০ উপজেলার ৪০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরঞ্জাম পৌঁছেছে; শেষ পর্যন্ত ১৪১টি প্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোর লক্ষ্য। ইউএনডিপির ‘উইমেন অ্যান্ড গার্লস এমপাওয়ারমেন্ট থ্রু ইনক্লুসিভ এডুকেশন’ কর্মসূচি দূরবর্তী এলাকার শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা ও লিঙ্গ-সংবেদনশীল পাঠদান প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বৈষম্য কমাতে সহায়তা করছে।

কৌতূহলের নতুন যাত্রা
চক-ডাস্টারের ক্লাসরুম এখন প্রশ্ন, পরীক্ষা ও আবিষ্কারের মঞ্চ। ময়না ও তার বন্ধুরা আর শুধু জ্ঞান গ্রহণ করছে না—তারা বিশ্বকে দেখতে, ছুঁতে ও বুঝতে চায় দুর্বার কৌতূহল নিয়ে। সূর্যালোকে চলা এই শিক্ষা-যাত্রা পার্বত্য অঞ্চলের হাজারো শিশুর মাঝে বুনে দিচ্ছে স্বপ্ন দেখার ও স্বপ্ন পূরণের সাহস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *