নুরুল হক
মানুষের জীবনটা বড় অদ্ভুত। আমরা মনে করি আমরা সব জানি, অথচ আমাদের খুব কাছেই পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে যে কত কত রূপকথা ধুলো মাখছে, তার খবর ক’জন রাখি? সম্প্রতি (২৮ ফেব্রুয়ারি) স্বপ্নময় প্রোডাকশনের উদ্যোগে ও আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার সহযোগিতায় তাদের নুভেল ভগ অডিটোরিয়ামে প্রদর্শিত প্রামাণ্যচিত্র ‘ম্রো রূপকথা’ এবং অ্যানিমেশন ফিল্ম ‘পরিণাম’ দেখতে দেখতে বারবার মনে হচ্ছিল, এটি কেবল সিনেমা নয়; এটি আসলে বহু বছর ধরে এক কোণে পড়ে থাকা এক অভিমানী জনগোষ্ঠীর জমানো কিছু দীর্ঘশ্বাস, যা আজ আমাদের কানে এসে পৌঁছাল।
যখন পর্দা জুড়ে ইয়াংঙান ম্রো নামের মানুষটিকে দেখি, তখন বিস্ময়ে থমকে যাই। শৈশবে ক্লাসরুমে বসে তিনি শিক্ষকের বাংলা কথা কিছুই বুঝতেন না, শুধু বোকার মতো চেয়ে থাকতেন। সেই ম্রো ছেলেটিই একদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে ম্রো ভাষায় প্রথম বই লিখে ফেললেন। ভাবা যায়?
ছবির পরিচালক নাজমুল হুদা খুব যত্ন করে দেখিয়েছেন, কীভাবে ইয়াংঙান তাঁর নিজস্ব জগতের গল্প বলছেন। সেই গল্পে আছে জুমচাষের ঘ্রাণ আর ঝিরির কলকল শব্দ। আর আছে ম্রোদের সেই বিখ্যাত উৎসব—চিয়াসদ পয়। উৎসবে গো-হত্যা করা হয়, বাঁশির সুরে নেচে ওঠে একদল তরুণ-তরুণী। শুনতে হয়তো খটকা লাগে, কিন্তু এই উৎসবের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিপন্ন অস্তিত্বের হাহাকার। ম্রোদের বিশ্বাস ভগবানের দেয়া ম্রো বর্নমালা এক গরু খেয়ে ফেলেছিল, তাই এই বলি আসলে এক হারানো জ্ঞান পুনরুদ্ধারের প্রতীকী লড়াই।। ম্রোদের নিজস্ব বর্ণমালা আছে, যা মেনলে ম্রো নামের এক কিশোরের স্বপ্নে পাওয়া। এই সিনেমার পরতে পরতে যেন সেই স্বপ্ন আর বাস্তবের এক মায়াবী লড়াই খেলা করে।
প্রামাণ্যচিত্রের সাথে আবার একটা ছোট্ট চমক লুকানো ছিলো—১০ মিনিটের একটি অ্যানিমেশন ফিল্ম, নাম ‘পরিণাম’। ইয়াংঙান ম্রোর লেখা গল্প থেকেই এটি বানানো। নির্মাতা নাজমুল হুদা জানান, “এটি বাংলাদেশের প্রথম বাংলা বর্হিভূত ভিন্ন ভাষার অ্যানিমেশন।” তথ্যটা শুনতে বড় খটখটে লাগে। বরং বলা যায়—এটি ম্রোদের হৃদস্পন্দন। ম্রো ভাষায় যখন পর্দার চরিত্ররা কথা বলে ওঠে, তখন মনে হয় পাহাড় নিজেই কথা বলছে।
প্রামাণ্যচিত্রটির প্রদর্শনীর সময় অডিটোরিয়ামে যে পিনপতন নীরবতা ছিল, তা কোনো সাধারণ নীরবতা নয়। এটি ছিল এক ধরনের মুগ্ধতা। শহরের যান্ত্রিক মানুষ যখন পাহাড়ের গহীনের গল্প শোনে, তখন তারা নিজেদের অজান্তেই একটুখানি শুদ্ধ হয়ে যায়।
সিনেমায় উঠে এসেছে ক্রামাদি মেনলের প্রবর্তিত ক্রামা ধর্মের কথা, যা ম্রোদের আধ্যাত্মিক জগতের এক অনন্য অংশ। বন-পাহাড় আর ঝিরির দেশে নারীদের যে জীবনসংগ্রাম, তা আমাদের চেনা নাগরিক যন্ত্রণার চেয়েও অনেক বেশি তীব্র। প্রামাণ্যচিত্রটি দেখতে দেখতে মনে হয়, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও ইয়াংঙান ম্রো কেন আজও তাঁর শিকড়কে আঁকড়ে ধরে আছেন। হয়তো তিনি জানেন, শিকড় ছিঁড়ে গেলে মানুষ আর মানুষ থাকে না, কেবল যান্ত্রিক পুতুল হয়ে যায়।
পর্দা যখন কালো হয়ে আসে, তখন মনের ভেতর একটা অদ্ভুত সুর বাজতে থাকে। সেই সুরটা ইয়াংঙানের কলমের—যে কলম দিয়ে তিনি হারিয়ে যেতে বসা একটি ভাষাকে পরম মমতায় আগলে রেখেছেন। ইয়াংঙান তো কেবল একজন লেখক নন, তিনি যেন এক জাদুকর; যিনি পাহাড়ের ধুলোবালি থেকে নিজের মাতৃভাষাকে কুড়িয়ে এনে সযত্নে সাজিয়ে দিচ্ছেন রূপকথার মালায়। পাহাড়ের এই ভাষা যখন পর্দায় উঠে আসে, তখন তা শুধু ম্রোদের থাকে না—তা হয়ে ওঠে পুরো বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক অদ্ভূত সুন্দর দলিল। আমাদের এই যান্ত্রিক শহরে যদি একটুখানি পাহারের বাঁশির সুর প্রতিদিন বাজত, তবে মানুষগুলো বোধহয় আরেকটু বেশি সংবেদনশীল হতো।
পরিচালক নাজমুল হুদা সরকারি অনুদানের টাকায় (২০১৯-২০) এই মহৎ কাজটি শুরু করেছিলেন। তবে আমাদের দেশে অনুদানের ছবি মানেই তো আমরা চোখের সামনে গম্ভীর আর নিরস কোনো দৃশ্য কল্পনা করি। কিন্তু ‘ম্রো রূপকথা’ ও ‘পরিণাম’-এ সেই শুষ্কতা নেই; এখানে প্রাণ আছে, পাহাড়ের ধুলোমাখা জীবনের এক স্নিগ্ধ ঘ্রাণ আছে। এই পথচলাটা খুব সহজ ছিল না। শুধু সরকারি টাকা নয়, ‘ম্রো রূপকথা’র পেছনে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে প্রাইম ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট পিএলসি-র মতো প্রতিষ্ঠান। আর ‘পরিণাম’ তৈরির গল্পটা তো আরও বেশি আবেগের। নিজের পকেটের টাকা আর আত্মীয়-বন্ধুদের ভালোবাসার পাশাপাশি কর্ণফুলী পাওয়ার লিমিটেড পাশে না দাঁড়ালে হয়তো এই রূপকথা পর্দায় আসত না। নির্মাতার এখন একটাই স্বপ্ন—পাহাড়ের এই বুকচেরা আর্তনাদ আর সৃষ্টির আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সব বিশ্ববিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র আর ফিল্ম ক্লাবগুলোতে। মানুষ জানুক, কুয়াশার ওপারেও এক মায়াবী জগত আছে।