মাগুরার শালিখা উপজেলার শতপাড়া গ্রামে ঘোড়া জবাই করে গরুর মাংস বলে বিক্রির চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা দাবি করছেন, বহুদিন ধরেই এক মাংস ব্যবসায়ী গোপনে প্রতারণার মাধ্যমে মানুষকে ধোঁকা দিয়ে আসছিলেন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রবিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ভোর রাতে শতপাড়া গ্রামের মাংস বিক্রেতা হিরণ বিশ্বাস নিজের বাড়ির পেছনে চিত্রা নদীর তীরে নির্জন স্থানে একটি ঘোড়া জবাই করেন। পরিকল্পনা ছিল ঘোড়ার মাংসকে গরুর মাংস বলে বাজারে বিক্রি করা। তবে স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে হিরণ বিশ্বাস পালিয়ে যান। পরে তারা জবাইকৃত ঘোড়ার দেহ পড়ে থাকতে দেখে হাজরাহাটি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে খবর দেন।
দীর্ঘদিনের অভিযোগ
এলাকাবাসীর অভিযোগ, হিরণ বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে একই কৌশলে ঘোড়ার মাংস বাজারে গরুর নামে বিক্রি করে আসছিলেন। অনেকেই বিষয়টি সন্দেহ করলেও প্রমাণের অভাবে প্রকাশ্যে আসেনি। এবার হাতে-নাতে ধরা পড়ায় প্রতারণার ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে।
গ্রামের একাধিক ব্যক্তি জানান, “আমরা আগে বুঝতেই পারিনি। তবে হঠাৎ ভোরে জবাইয়ের শব্দ ও আচরণে সন্দেহ হলে গিয়ে দেখি ঘোড়া পড়ে আছে। সে (হিরণ) পালিয়ে যায়। এখন ভয় হচ্ছে, এতদিন আমরা কী খেয়েছি?”
পুলিশের বক্তব্য
হাজরাহাটি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ সুলতান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন,
“খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে জবাইকৃত একটি ঘোড়া পড়ে থাকতে দেখা যায়। তবে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই অভিযুক্ত পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা যায়নি। তদন্ত চলছে।”
আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী—ভোক্তাকে প্রতারণার মাধ্যমে ভুল তথ্য দিয়ে পণ্য বিক্রি করলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ধরা হয়। এ ক্ষেত্রে জরিমানা ও কারাদণ্ড দুটোই হতে পারে। এছাড়া পশু জবাই ও খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত অন্যান্য আইনও লঙ্ঘিত হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ভোক্তা প্রতারণাই নয়, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগও এ ঘটনায় প্রযোজ্য হতে পারে। কারণ মুসলিম প্রধান এলাকায় ঘোড়ার মাংসকে গরুর মাংস হিসেবে বিক্রি করার চেষ্টা মানুষের ধর্মীয় আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর আঘাত।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর শতপাড়া ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকে বলছেন, এতদিন তারা যে মাংস কিনেছেন, তা আসলেই গরুর ছিল কি না—সে বিষয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
একজন অভিভাবক বলেন, “আমাদের সন্তানরা কী খেয়েছে, এখন তা নিয়েই শঙ্কা হচ্ছে। এটা শুধু প্রতারণা নয়, আমাদের স্বাস্থ্যের জন্যও বিপজ্জনক।”
বাজার নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা
ভোক্তারা অভিযোগ করেছেন, মাংসের বাজারে নিয়মিত কোনো সরকারি নজরদারি নেই। মাংস বিক্রির আগে কোনো পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। এতে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের যৌথভাবে বাজারে নজরদারি বাড়ানোর দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা। এছাড়া অভিযুক্ত ব্যবসায়ীকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ঘটনাটি শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং জনস্বাস্থ্য, ভোক্তা অধিকার ও ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে জড়িত একটি গুরুতর বিষয়। তাই তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন ও জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।