
ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম
দেশে বর্তমানে ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী প্রায় ৫ কোটি শিশুকে টাইফয়েডের টিকা দেওয়া হচ্ছে। এই বিশাল কর্মসূচির প্রেক্ষিতে অভিভাবকদের এই টিকাটি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানার অধিকার রয়েছে।
বাংলাদেশে যে টিকাটি দেওয়া হচ্ছে, তার নাম TyphiBEV। এটি টাইফয়েডের নতুন ধরনের একটি টিকা, তৈরি করেছে ভারতের বায়োলজিক্যাল ই কোম্পানি। টিকাটি একটি Vi-polysaccharide conjugate vaccine, যাকে সংক্ষেপে বলা হয় TCV (Typhoid Conjugate Vaccine)।
আরেকটি একই ধরনের TCV ভ্যাকসিন হলো Typbar-TCV, যেটি তৈরি করেছে ভারতের ভারত বায়োটেক। এই টিকাটির সব ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে বৃহৎ পরিসরে এবং এটি অত্যন্ত কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে—৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কার্যকারিতা।
বাংলাদেশেও এই টিকাটির ডাবল-ব্লাইন্ড ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে ৬০ হাজার শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কের ওপর, যার নেতৃত্ব দিয়েছেন আইসিডিডিআরবির ড. ফেরদৌসী কাদরী।
তবে বাংলাদেশে কেন Typbar-TCV না দিয়ে TyphiBEV টিকাটি প্রয়োগ করা হচ্ছে—এর কারণ স্পষ্ট নয়।
TyphiBEV-এর কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন হয়নি। তাই এই ভ্যাকসিনটি টাইফয়েড প্রতিরোধে কতটা কার্যকর হবে, তা নিশ্চিতভাবে জানা নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র ওয়েবসাইটেও বলা আছে—TyphiBEV-এর কোনো ক্লিনিক্যাল এফিকেসি ডেটা নেই।

যদিও Typbar-TCV ও TyphiBEV—দু’টিই WHO-এর prequalified ভ্যাকসিন তালিকায় রয়েছে, অর্থাৎ উভয়ই জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত। প্রশ্ন হচ্ছে, ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ছাড়াই TyphiBEV কীভাবে এপ্রুভাল পেল?
TyphiBEV-এর ওপর দুটি ফেজ-২ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়েছে, যেখানে দেখা গেছে টিকাটি নিরাপদ এবং শরীরে যথেষ্ট পরিমাণে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। এই অ্যান্টিবডির পরিমাণ Typbar-TCV-এর মতোই। এই তুলনাভিত্তিক অনুমোদন পদ্ধতিকে বলা হয় ইমিউনোব্রিজিং বা নন-ইনফেরিওরিটি অ্যাসেসমেন্ট। অর্থাৎ ধরে নেওয়া হয়েছে—অ্যান্টিবডি প্রতিক্রিয়া যেহেতু সমান, কার্যকারিতাও তেমনই হবে। WHO-ও এই ভিত্তিতেই TyphiBEV-এর অনুমোদন দিয়েছে।
WHO-এর প্রতিবেদনে TyphiBEV-কে নিরাপদ বলা হলেও, কোথাও উল্লেখ করা হয়নি এটি কতটা কার্যকর। কারণ, কার্যকারিতা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয় তথ্য এখনও অনুপস্থিত। বর্তমান ডেটা থেকে কেবল এটুকুই বলা যায়—TyphiBEV সম্ভবত কার্যকর (potentially effective)। WHO-এর সর্বশেষ রিপোর্ট (১৮ ডিসেম্বর ২০২৪) অনুযায়ী, কোম্পানিটিকে কার্যকারিতা পরীক্ষা চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রিপোর্টে স্পষ্টভাবে বলা আছে—
“The company is committed to conduct an effectiveness study.”
যে ৫ কোটি শিশুকে এই টিকা দেওয়া হচ্ছে, তাদের অভিভাবকদের জানানো উচিত—এটি নিরাপদ, তবে কার্যকারিতা এখনও নিশ্চিত নয়। এটাই ন্যায়সংগত এবং বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক তথ্য। গ্লোবাল নর্থ বা গ্লোবাল সাউথ—সবখানেই ভ্যাকসিন ব্যবহারে একই নৈতিকতা ও মানদণ্ড অনুসরণ করা জরুরি।
দুঃখজনকভাবে, কিছু চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী Typbar-TCV-এর ট্রায়ালের তথ্য দিয়ে TyphiBEV-এর কার্যকারিতা প্রমাণের চেষ্টা করছেন। তারা বলছেন, দুটি টিকাই এক রকম—কিন্তু আসলেই কি তাই?
দুটি ভ্যাকসিনই কনজুগেট বা TCV ভ্যাকসিন—এটা সত্য। কিন্তু তাদের উপাদান, অ্যান্টিজেন সোর্স এবং কেরিয়ার প্রোটিন ভিন্ন। এবং দুটোই আলাদা কোম্পানির তৈরি।
TCV ভ্যাকসিনে দুটি মূল উপাদান থাকে—
একটি হলো Vi-polysaccharide (সালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়ার ক্যাপসুল থেকে পাওয়া) এবং অন্যটি carrier protein।
Typbar-TCV-এ Vi-polysaccharide এসেছে Salmonella typhi থেকে এবং সেটি যুক্ত করা হয়েছে Tetanus toxoid (TT) প্রোটিনের সঙ্গে। অন্যদিকে, TyphiBEV-এ Vi-polysaccharide নেওয়া হয়েছে Citrobacter freundii ব্যাকটেরিয়া থেকে (যার সঙ্গে টাইফয়েডের সরাসরি সম্পর্ক নেই), এবং যুক্ত করা হয়েছে Diphtheria toxoid (CRM197) প্রোটিনের সঙ্গে।
যদিও এই দুই উৎসের Vi-polysaccharide অণুগুলোর গঠন কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ, কিন্তু তাদের O-acetylation প্রক্রিয়া ভিন্ন। এই অংশটাই মূলত শরীরে ইমিউন রেসপন্স সৃষ্টি করে।
সুতরাং Vi-polysaccharide উৎস ও কেরিয়ার প্রোটিনের এই পার্থক্যের কারণে Typbar-TCV এবং TyphiBEV-এর কার্যকারিতা ভিন্ন হতে পারে। এই কারণেই, ফেজ-৩ ট্রায়ালের ফলাফল ছাড়া কার্যকারিতা নিয়ে নিশ্চিত মন্তব্য করা বৈজ্ঞানিক নয়।
এই লেখার উদ্দেশ্য—TyphiBEV ভ্যাকসিন সম্পর্কে সঠিক তথ্য জনগণের কাছে তুলে ধরা, যাতে তারা সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
শেষে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—
যে ভ্যাকসিন (Typbar-TCV) বাংলাদেশের ৬০,০০০ মানুষের ওপর ট্রায়াল সম্পন্ন করেছে, সব ধাপের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে এবং ৮৫ শতাংশ কার্যকারিতা দেখিয়েছে, সেই পরীক্ষিত টিকাটি বাদ দিয়ে কেন এমন একটি টিকা (TyphiBEV) দেওয়া হচ্ছে, যার কার্যকারিতা এখনো অজানা?
টাইফয়েড নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা—তবে এটি কোনো মহামারি বা স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা নয়। প্রতিবছর দেশে প্রায় ৫ হাজার শিশু টাইফয়েডে মারা যায়, কিন্তু একই সময়ে ২৪ হাজার শিশু মারা যায় নিউমোনিয়ায়, যদিও গত এক দশক ধরে নিউমোনিয়ার টিকা দেওয়া হচ্ছে।
প্রশ্ন জাগে—শুধু টিকাই কি সব সমস্যার সমাধান?
ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি
মলিকুলার সায়েন্টিস্ট, শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য