
বিজয় মজুমদার
বাংলাদেশে একজন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ নাগরিকের পক্ষে আইনের আশ্রয়ে ন্যায়বিচার পাওয়া কতটা কঠিন—সেটিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকের অভিজ্ঞতায়। মেধা, সততা ও মানবিকতার জন্য পরিচিত এই শিক্ষক নিজের বৈধ জমি ফিরে পেতে বছরের পর বছর ঘুরছেন পৌরসভা, পুলিশ ও প্রশাসনের দ্বারে, কিন্তু আজও নিজের জায়গা ফেরত পাননি।
ঘটনাটি দিনাজপুর জেলার এক পৌর এলাকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওই ব্যক্তি নিজের পৈতৃক সম্পত্তিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছিলেন। একসময় এলাকার এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক কর্মী হঠাৎ সেই জমির ওপর দেয়াল তুলে দাবি করেন—জমিটি তাঁর। অধ্যাপকের কাছে সব বৈধ কাগজপত্র ও মালিকানার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও দখলদার কোন আদালতের রায় ছাড়াই জায়গাটি ঘিরে নেয়।
অধ্যাপক তখন পুলিশের সহায়তা চান। কিন্তু স্থানীয় পুলিশ তাকে জানায়, “শান্তি শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায়” তারা ঘটনাস্থলে যাবে না। ফলে চোখের সামনেই নিজের জমি হারান ওই অধ্যাপক।
এরপর তিনি পৌরসভায় লিখিত অভিযোগ করেন। প্রায় এক বছর পর পৌর কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মাপজোকের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়, জায়গাটি সত্যিই অধ্যাপকের। তারা চিঠি দিয়ে দখলদারকে দেয়াল ভাঙতে অনুরোধ জানায়। কিন্তু দখলদার স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “কাউকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য জায়গা দখল করিনি।”
পরিস্থিতি পাল্টায় যখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে ওই প্রভাবশালী ব্যক্তি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। তখনও অধ্যাপক নিজে দেওয়াল ভাঙতে অস্বীকার করেন। তাঁর যুক্তি, “আইন আমাকে সেই অধিকার দেয়নি। রাষ্ট্রই আমার জায়গা বুঝিয়ে দেবে।”
আইনের প্রক্রিয়ায় জমি উদ্ধারের উপায় জানতে গিয়ে জানা গেছে, এটি দেওয়ানী আদালতের মামলা হিসেবে দায়ের করতে হয়। কাগজপত্র বৈধ হলেও রায় পেতে সময় লাগে বহু বছর—প্রথমে লোয়ার কোর্ট, তারপর রিভিউ, হাইকোর্ট ও শেষে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যেতে হয়। আইনজীবীদের মতে, এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে গড়ে ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লাগে, আর খরচও হয় বিপুল।
অধ্যাপক এখন মামলা না করে ন্যায়বিচারের বিকল্প কোনো পথ খুঁজছেন। তাঁর প্রশ্ন—“রাষ্ট্র কি ন্যায়পরায়ণ নাগরিকের জন্য বন্ধু বৎসল?”
বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার নাগরিক জমি দখল, ভোগদখল বিরোধ ও সম্পত্তি সংক্রান্ত জটিলতায় আইনের দ্বারে আশ্রয় নেন। কিন্তু মামলা নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও প্রভাবশালীদের প্রভাব ন্যায়বিচারের পথকে কঠিন করে তোলে—এই অধ্যাপকের ঘটনা যেন সেই বাস্তবতার প্রতিফলন।