শুরু ২০০৬ সাল থেকেই
বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবনতি নতুন নয়

 

বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একধরনের হাহাকার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেকেই লিখছেন, “বাংলাদেশি পাসপোর্ট মানেই বিদেশে অপমান”—আবার কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, “ভিসা পাওয়া এখন প্রায় অসম্ভব।” কিন্তু তথ্য-উপাত্ত বলছে, বাংলাদেশের পাসপোর্টের এই দুরবস্থা নতুন কিছু নয়। প্রায় দুই দশক ধরেই এর ক্রমাবনতি ঘটছে।

শুরুর বছরেই সবচেয়ে ভালো অবস্থান

ব্রিটেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Henley & Partners প্রতি বছর প্রকাশ করে Henley Passport Index, যেখানে বিশ্বের পাসপোর্টগুলোর র‍্যাংক নির্ধারণ করা হয় নাগরিকদের ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল প্রবেশাধিকার অনুযায়ী।

এই সূচকে বাংলাদেশের পাসপোর্টের সর্বোচ্চ অবস্থান ছিল ২০০৬ সালে, যখন র‍্যাংকিং চালু হয়। ওই বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৬৮তম। তখন বাংলাদেশের নাগরিকরা প্রায় ৪০টি দেশে ভিসা ছাড়াই যেতে পারতেন।

তবে পরবর্তী বছরগুলোতে সেই সংখ্যা ক্রমে কমে আসে, এবং ২০০৯ সালে অবস্থান নেমে যায় ৭৩তম স্থানে

২০১০ থেকে অবনতি শুরু

২০০৯ সালের শেষে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ সরকার। ২০১০ সাল, সরকারের প্রথম পূর্ণ বছরেই বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবস্থান ১২ ধাপ নেমে যায়—৮৫তম স্থানে। এরপর ২০১২ সালে র‍্যাংক আরও নিচে গিয়ে দাঁড়ায় ৯৩। ২০১৫ সালে এসে সূচক কমে হয় ৯৯

২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের পাসপোর্ট প্রায় ১০০ নম্বরের আশপাশে ঘুরেছে। ২০২১ সালে এসে ইতিহাসের সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছে যায়—১০৮তম

বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই সময়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশির ইউরোপে অনুপ্রবেশ, আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানবপাচারের ঘটনাগুলো বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলেই একে একে অনেক দেশ বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা নীতিতে কঠোরতা আনে।

২০২৪-এ সামান্য উন্নতি, ২০২৫-এ আবার পতন

Henley-এর সর্বশেষ সূচক অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের পাসপোর্ট কিছুটা উন্নতি করে ৯৭তম স্থানে উঠে আসে।
তবে ২০২৫ সালে আবার তিন ধাপ পিছিয়ে ১০০ নম্বরে গেছে।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার ভাষায়,

“রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী বৃদ্ধি এবং কিছু দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে এই সামান্য পতন স্বাভাবিক। তবে তুলনামূলকভাবে এটা কোনো ‘বড় বিপর্যয়’ নয়।”

দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান

Henley Passport Index ২০২৫ অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর র‍্যাংকিং হলো—

দেশ র‍্যাংক (২০২৫) ভিসামুক্ত দেশ সংখ্যা
ভারত ৬২ ৬৪টি
মালদ্বীপ ৫৮ ৮৮টি
নেপাল ৯৯ ৪০টি
বাংলাদেশ ১০০ ৩৯টি
শ্রীলঙ্কা ৯৬ ৪২টি
পাকিস্তান ১০৪ ৩৩টি
আফগানিস্তান ১০৯ ২৮টি

অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রায় নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সমান, তবে পাকিস্তানের চেয়ে কিছুটা ভালো।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ  ড. খুরশিদ আলম মনে করেন,

“একটি দেশের পাসপোর্টের মান কেবল প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, মানবাধিকার চিত্র এবং বৈদেশিক সম্পর্কের প্রতিফলন। বাংলাদেশের পাসপোর্ট দুর্বল হওয়া মানে, আন্তর্জাতিক আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে।”

অভিবাসনবিষয়ক গবেষক মো. কামরুল ইসলাম বলেন,

“অবৈধ অভিবাসন ও জাল পাসপোর্ট ইস্যুর ইতিহাস বাংলাদেশের জন্য বড় সমস্যা। বিশ্বের অনেক দেশ এখন বাংলাদেশিদের ভিসা দিতে আগে যাচাই-বাছাই বাড়িয়েছে। এটা পাসপোর্ট সূচকে প্রভাব ফেলছে।”

কেন এই ‘হাহাকার’

তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবনতি একদিনে হয়নি। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে সাম্প্রতিক ‘হাহাকার’ বেড়েছে কারণ, বিশ্বের অনেক দেশ এখন কড়া নিরাপত্তা যাচাই ছাড়া ভিসা দিচ্ছে না। ইউরোপের বহু দেশ রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশিদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তাদের ভিসা নীতি কঠোর করেছে।

তবে বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের পাসপোর্ট আজও বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশে ভিসা ছাড়াই প্রবেশের সুযোগ দেয়। অর্থাৎ, “সব দেশই দরজা বন্ধ করে দিয়েছে”—এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়।

বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবনতি কোনো একক সরকারের আমলের ফল নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক দুর্বলতা, অবৈধ অভিবাসন, এবং আন্তর্জাতিক আস্থার সংকটের যৌথ ফলাফল।

আজকের ক্ষোভের মূলে আছে বহু বছরের ধারাবাহিক অবনতি, যার সূচনা হয়েছে ২০০৬ সালের পর থেকেই। তাই হঠাৎ করে পাসপোর্টের মান “খারাপ হয়ে গেছে” বলা যেমন ভুল, তেমনি “আগে খুব ভালো ছিল” বলাও বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *