শিক্ষাঙ্গণের অস্থিরতায় জাতির অস্বস্তি

 

মারুফ আহমেদ

বিগত সরকারের ১৫–১৬ বছরের নজিরবিহীন শাসনের পর দেশে যেন নতুন করে ‘ইতিহাস’ রচনার কবর খোঁড়া শুরু হয়েছে। চারপাশে অস্থিরতার গুমোট। ফেসবুকে কোনো ঘটনা ঘটতে না ঘটতেই ভাইরাল হয়ে যায়। কিন্তু প্রতিকার বা সমাধান কোথাও নেই। অন্তবর্তী সরকারের রাষ্ট্রীয় দপ্তরগুলোতেও দেখা যাচ্ছে বিশৃঙ্খলা ও অপেশাদারিত্বের ছাপ।

শীত আসছে, অথচ দেশের মানুষ জবুথুবু। সরকারের ভাবমূর্তি নিয়ে শঙ্কিত জাতি। প্রশাসনের কাজে নেই তত্পরতা। কোনো ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান না হওয়ায় নতুন নতুন সংকটের জন্ম হচ্ছে। বড় সমস্যা গোড়াপত্তন করে ছোটখাটো বিষয় থেকেই।

শিক্ষা: মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চনা

শিক্ষা আজ মৌলিক অধিকার হিসেবেও যেন বিলুপ্ত। পাড়ার প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ—কোথায় আছে লেখাপড়ার পরিবেশ? শিক্ষাকে ধুলায় মেশানোর চক্রান্ত চলছে প্রকাশ্যে। ৫ আগস্টের পর থেকেই জাতি বুঝে গেছে, দেশ ভালো নেই। লেখাপড়া ও শিক্ষাঙ্গন এখন এতিমের মতো অবস্থায়।

এক সপ্তাহের দৃষ্টান্তই যথেষ্ট। চারদিকে শুধু রঙ্গভুজুঙ্গের বায়োস্কোপ!

শিক্ষক-শিক্ষার্থী আন্দোলনের ঘূর্ণিতে

অভিভাবকেরা সন্তানদের মানুষ করার স্বপ্ন নিয়ে স্কুল-কলেজে পাঠান। কিন্তু সদ্য এসএসসি পাস করা ছাত্রছাত্রীরা কী দেখছে? আদর্শ শিক্ষকেরা রাজপথে আন্দোলনে, দাবি আদায়ে ব্যস্ত! বছরে কয়দিন লেখাপড়া হয়—ক্যালেন্ডার খুলে দেখলেই বোঝা যায়। ছাত্রদের দাবি, শিক্ষকদের দাবি—অবিরাম আন্দোলনের এক অবসানহীন খেলা।

যদিও শিক্ষকেরা কিছু দাবি আদায় করে ফিরেছেন, কিন্তু শিক্ষাঙ্গনের গরম বাস্প কমেনি। বাতাস যেদিকে, তরী ওদিকে—এই যেন আজকের শিক্ষা পরিস্থিতি।

ছাত্ররাজনীতি না ছাত্রনৈরাজ্য

দেশের সবচেয়ে সংবেদনশীল শব্দ এখন ‘স্টুডেন্ট’। ওদের মগজে আগুন, আর কে যেন প্রতিদিন ঘি ঢেলে দিচ্ছে! কেন কলেজপড়ুয়া ছাত্ররা রাজনীতিতে নামছে, কার প্ররোচনায়? সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে চলছে চাঁদাবাজি ও দাদাগিরির মহোৎসব। হামলা-মারামারি, পক্ষ-বিপক্ষের সংঘর্ষে শিক্ষাঙ্গন রণক্ষেত্রে পরিণত।

আজ শিক্ষার স্থলে অস্থিরতা, ছাত্রদের মধ্যে বিভাজন। প্রশাসনের নীরবতা বিষয়টিকে আরও ভয়াবহ করছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ছাত্রদের ব্যবহার হচ্ছে কি না—তা খতিয়ে দেখা এখন জরুরি। কোমলমতি প্রজন্মকে রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারের।

পুরনো অরাজকতার পুনরাবৃত্তি

ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের পর তাদের দোসররা যেভাবে দেশে অরাজকতা ছড়িয়েছিল, সেই রেষ আবার দেখা দিচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার না করলে ভয়াবহ পরিণতি আসতে পারে।

ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ, ধানমন্ডি আইডিয়াল—এই তিনটি কলেজের সাম্প্রতিক সংঘর্ষ যেন তারই প্রমাণ। সামান্য রেষারেষি থেকে শুরু হয়ে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় ক্যাম্পাস এলাকা। ছাত্ররা ভাই-বন্ধুর বদলে পরস্পরের শত্রু হয়ে উঠছে। কারা ওদের এমন করছে, কারা ওদের হাতে ইট-পাথর তুলে দিচ্ছে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।

অমানবিকতার শিক্ষা

ভৈরবকে জেলা করার চক্রান্তে ট্রেন থামাতে ছাত্রদের হাতে পাথর তুলে দেওয়া হয়েছিল। নোয়াখালীতে টুপি-বিতর্কে এক ছাত্র অন্য ছাত্রকে গলা কেটে হত্যা করেছে! এ কোন শিক্ষা? মানুষকে মানুষ বানাতে না পারলে এই শিক্ষার মূল্য কোথায়?

ছাত্ররা নিজেদের ভালোমন্দ বোঝে না—এই বোধের ঘাটতি কি তাদের নয়, নাকি শিক্ষকদেরও দায় আছে? ঢাকা একসময় মসজিদের নগরী ছিল, এখন তা কলেজ-ভার্সিটির নগরীতে পরিণত। শিক্ষার মান আকাশ ছোঁয়ার কথা ছিল, অথচ ‘থুথু’ ফেলার মতো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা! কোটি টাকার ক্ষতি, আগুন, ধ্বংসযজ্ঞ—সবই ঘটছে ‘শিক্ষিত’ প্রজন্মের হাতে।

এই ‘থুথু যুদ্ধ’ নিছক ঘটনা নয়। এর পেছনে অন্য উদ্দেশ্য থাকতে পারে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সচিব ও উপদেষ্টাদের উচিত ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করা। তা না হলে সরকারের ভূমিকা ছাত্রদের এক দলা থুথুর চেয়েও জঘন্য হয়ে উঠবে।

তদন্ত কমিটি গঠনই যদি শেষ কথা হয়, তবে এই আগুন থামবে না। প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী—সবাইয়ের ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। সময়মতো কেউ এগিয়ে আসে না কেন?

প্রতিটি বাবা-মা আজ দিশেহারা। তারা সন্তানকে মানুষ করতে চান, যোদ্ধা নয়। কিন্তু শিক্ষাঙ্গণের প্রতিটি দেয়াল এখন আগুনে জ্বলছে। এই আগুন কেবল ক্যাম্পাস নয়, জাতির বিবেককেও পুড়িয়ে দিচ্ছে।

 

মারুফ আহমেদ

লেখক, সাংবাদিক, নাট্যকার

2 thoughts on “শিক্ষাঙ্গণের অস্থিরতায় জাতির অস্বস্তি

Leave a Reply to nagorik.news Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *