স্মৃতির মুকুল

বিজয় মজুমদার

ঢাকার কাছেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। শহরের প্রান্তে হলেও শীতের সময় এই ক্যাম্পাস যেন নিজের আলাদা আবেশে জমে ওঠে। উত্তরের হাড়কাঁপানো ঠান্ডা হাওয়া এখানে এসে আবারও একবার কাঁপিয়ে দেয় জাবিকে।
কিন্তু আমাদের সময়ে জাহাঙ্গীরনগরকে জমিয়ে রাখত আরেকটি জিনিস—ক্রিকেট। (আশা করি এখনও সেটাই হয়!)

শীতের বিকেলে ব্যাট-বল হাতে মাঠে নামত বিভিন্ন বিভাগের তারকা খেলোয়াড়রা। তাদের খেলা দেখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ ঘিরে জড়ো হতো ভিড়। ভর্তি হওয়ার কিছুদিন পর ঢাকায় আমার এক মামার সঙ্গে দেখা হলো। খবর শুনে তিনি খুশি। তখন তিনি ঢাকার প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লীগের প্রথম শ্রেণির খেলোয়াড়—ইয়াং পেগাসাস দলে খেলতেন।

আমার মামার একটা মজার অভ্যাস ছিল—প্রতিটা কথার শুরু করতেন “কইলাম” দিয়ে।
—কইলাম! তুমি জাবিতে ভর্তি হইছো? ওইখানে আমার বন্ধুরা আছে।
আমি বললাম, “তাই নাকি!”
মামা আবার বললেন, “কইলাম, আমার বন্ধুরা ভারী দুষ্টু। এমন দুষ্টামি করে, হ্যাগো থাইকা ১০০ হাত দূরে থাকবা।”

মামার সেই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর নাম শাহরিয়ার (আমরা তাঁকে শাহরিয়ার মামু বলতাম)। শাহরিয়ার মামু ও তাঁর চার বন্ধু তখন জাহাঙ্গীরনগরে ‘পঞ্চ পাণ্ডব’ নামে বিখ্যাত। আরেক নামে তাঁরা পরিচিত ছিলেন—‘বিকেএসপি’। বিপ্লব, কাঞ্চন, খালেদ, শাহরিয়ার ও পিকলুর নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে এই নামের জন্ম।

তাদের দুষ্টুমি যেমন সবার মুখে মুখে, তেমনি ক্রিকেটেও তাঁরা ছিলেন প্রথম শ্রেণির। উল্লেখযোগ্য যে শাহরিয়ার মামুর বড় ভাই ইমরান সারোয়ার বর্তমানে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট দলের প্রধান কোচ।

মামা বললেন, “আমার এক ছোট ভাই এবার জাবিতে ভর্তি হইছে। কইলাম! আমার এই ছোট ভাই একদিন অনেক নাম করবো, দেইখা নিও।”

বিখ্যাত ক্রিকেটার হতে যাওয়া সেই ‘ছোট ভাইয়ের’ খোঁজে একদিন আমি গেলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেশিয়ামে। অনেকেই তখন অনুশীলনে ব্যস্ত। কিন্তু তাঁদের ভেতর একজনকে দেখে মনে হলো, এ যেন আলাদা কেউ। হেলমেট ছাড়াই ফাস্ট বোলারদের বল সামলাচ্ছে, ব্যাট এমনভাবে চালাচ্ছে যেন যুদ্ধের তলোয়ার। মাথায় বাঁধা রুমাল, শীতের দুপুরেও ঘাম ঝরছে মুখ বেয়ে, কিন্তু প্র্যাকটিস থেমে নেই।

মনে হলো, এ নিশ্চয়ই মামার সেই ছোট ভাই। আমি কিছু বলতে যাচ্ছি বুঝতে পেরে তিনি ব্যাট থামিয়ে বোলারকে ইশারা করলেন।
বললেন, “ভাই, কিছু বলবেন?”
আমি বললাম, “আপনার নাম কি মুকুল?”
ব্যাটিংয়ের সময় যতটা আত্মবিশ্বাসী লাগছিলেন, এখন ততটাই শান্ত।
তিনি বললেন, “জি ভাই, আমার নাম মুকুল।”

আমি বললাম, “আমার মামু আপনার কথা বলেছেন।”
তিনি হেসে বললেন, “আরে ভাই, উনি তো আমার ক্রিকেটীয় বড় ভাই।”
“ভাই, আপনি কোন ব্যাচে?”
“আমি আর আপনি একই ব্যাচের,” বললাম আমি।
“আরে কও কি! তাইলে আমরা দোস্ত। কিন্তু তোমার মামুরে আমি ভাই ডাকি, তাইলে তুমি তো আমার ভাগিনা! তুমি কি ক্রিকেট খেলো?”

তারপর শুরু হলো বন্ধুত্ব। মামার দেওয়া টিপস, আর আমার দুই বন্ধু মাহফুজ ও রেজার সহায়তায় আমি চতুর্থ শ্রেণির ক্রিকেটার থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে উন্নীত হলাম।

আমার সেই বন্ধু মুকুল পড়তেন ইতিহাস বিভাগে। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই প্রতিভাবান ক্রিকেটার। আমাদের সময়ে একাধিকবার ইতিহাস বিভাগকে চ্যাম্পিয়ন করেছিল তাঁর নেতৃত্বে। খেলায় ভাগিনাকে কোনো ছাড় দিতেন না—শুধু মার দিতেন (কি নিষ্ঠুর মামু!)। আমরা সবাই বিশ্বাস করতাম, একদিন জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁকে দেখব।

লীগে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাঁকে জাতীয় দলের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য আর আঘাত সেই দরজা খুলতে দেয়নি। তবুও মামার ভবিষ্যদ্বাণী বৃথা যায়নি।

খেলোয়াড় হিসেবে না পারলেও আম্পায়ার হিসেবে তিনি হয়েছেন বাংলাদেশের গর্ব। আজ তিনি শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের সেরা আম্পায়ারদের একজন।

পাঠক, ঠিক ধরেছেন—আমি কথা বলছি আম্পায়ার মাসুদুর রহমান মুকুল-এর।
বাংলাদেশের যে দুইজন আম্পায়ার বিশ্ব ক্রিকেটে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন, মুকুল তাঁদের একজন।

বলা যায়—
আম্পায়ার মুকুল, মানেই সিদ্ধান্ত প্রায় নির্ভুল।


 

 নোট:   লেখাটি লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিচারণ।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *