
বিজয় মজুমদার
যারা ফুটবল খেলে, তাদের বেশির ভাগেরই স্বপ্ন থাকে একজন বিখ্যাত ফুটবলার হওয়ার। তবে অনেক অভিভাবকের ধারণা—ফুটবলে মন দিলে পড়াশোনা নষ্ট হয়। আবার অনেক খেলোয়াড়ও নিজের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে না। প্রচলিত ধারণা হলো, ফুটবলাররা নাকি পড়াশোনায় ভালো হয় না।
এই ভুল ধারণা ভেঙেছেন আবু রাফা মোহাম্মদ আরিফ, যিনি সবাইকে চেনা ‘সুবিন’ নামে। আজ তিনি বাংলাদেশ সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। বিসিএসের মতো কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ তাঁর জীবনের শুরুটা ছিল ফুটবল মাঠে—একজন ফুটবলারের স্বপ্ন নিয়ে।
জামালপুরের মাঠ কাঁপানো ফুটবলার সুবিন একদিন চলে যান বিকেএসপিতে, দেশের শীর্ষ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে। সেখানে গিয়ে দেখেন, তাঁর মতো শত শত খুদে ফুটবলার এসেছে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে। সবার লক্ষ্য তখন মেসি, ম্যারাডোনা বা অন্তত সালাহউদ্দিন–আসলাম হওয়া।
নিজের প্রতি প্রবল বিশ্বাস ছিল তাঁর। বল পায়ে মাঠে যেমন আত্মবিশ্বাসে এগিয়ে যেতেন গোলের দিকে, ঠিক তেমনি এগিয়ে গেলেন জীবনের লক্ষ্য পূরণের পথে। বিকেএসপিতে ভর্তি হয়ে বুঝলেন—ফুটবল কেবল পায়ের খেলা নয়, এটি মস্তিষ্কেরও খেলা। তাই তিনি মন দিলেন পড়াশোনাতেও।
বিকেএসপি থেকে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে অনেকে যেখানে শুধু ফুটবলে মনোযোগ দেয়, সুবিন সেখানে ভর্তি হলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু একদিন খেলতে গিয়ে পায়ে আঘাত পান; ধীরে ধীরে মাঠে তাঁর গতি হারিয়ে যায়। আবাহনী বা মোহামেডানে খেলার স্বপ্ন দূরে সরে গেল। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিমেও নিয়মিত খেলা কঠিন হয়ে পড়ে তাঁর জন্য।
অন্য কেউ হলে হয়তো ভেঙে পড়তেন। কিন্তু সুবিন হাল ছাড়েননি। বিকেএসপি থেকে আসা ছেলেদের অনেকে তখনও বাঁকা চোখে দেখে, ভাবে—ওরা কেবল সার্টিফিকেট নিতে এসেছে, পড়াশোনায় তেমন মনোযোগী নয়। এই ধারণা ভাঙতেই সুবিন প্রস্তুতি নিলেন বিসিএসের জন্য।
প্রথমবারেই তিনি উত্তীর্ণ হন এবং প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেন একজন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে। সততা, নিষ্ঠা ও যোগ্যতার সঙ্গে কাজ করে এখন তিনি বাংলাদেশ সরকারের যুগ্ম সচিব।
পেশাগত ব্যস্ততায় ফুটবল এখন দূরের এক গল্প মনে হলেও, খেলার প্রতি তাঁর ভালোবাসা আজও অটুট। তিনি বিশ্বাস করেন—একজন ভালো ফুটবলারের পাশাপাশি একজন ভালো ছাত্র হওয়াও জরুরি। তাঁর মতে, “ভালো ছাত্র হলে ফুটবলেরও সুনাম বাড়ে।”
সুবিন তরুণ ফুটবলারদের বলেন, “শুধু বড় খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন দেখলেই হবে না, মনোযোগ দিতে হবে পড়াশোনাতেও। কারণ শিক্ষিত খেলোয়াড়রাই নিজের খেলার মান উন্নত করতে পারে এবং পরবর্তীতে সম্মানজনক পেশায় যুক্ত হতে পারে।”
বর্তমানে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক বা ফুটবল প্রশিক্ষক হিসেবে উচ্চশিক্ষিত খেলোয়াড়দের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। সরকারি চাকরিতেও রয়েছে সুযোগ।
শুধু খেলোয়াড়দের নয়, তিনি নিয়মিত পড়াশোনা করা তরুণদেরও খেলাধুলায় অংশ নিতে উৎসাহিত করেন। তাঁর ভাষায়, “সুস্থ দেহ মানেই সুন্দর মন।”
বিকেএসপি থেকে সচিবালয় পর্যন্ত সুবিনের পথচলা প্রমাণ করে—মনোযোগ, অধ্যবসায় ও সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে জীবনের প্রতিটি মাঠেই জয় সম্ভব।