মিরপুরের সকালটা বেশ নিরীহ দেখায়—হালকা কুয়াশা, কোথাও কোথাও শিশিরে ভেজা ঘাস, আর দূর থেকে পাখির ডাকে একরকম মায়া লেগে থাকে। তবু শহরের মানুষ জানে, এই মায়ার নিচেই লুকিয়ে আছে হাজারো শব্দ, ক্লান্তি আর কংক্রিটের গরম ধোঁয়া। ঠিক এই শহরের মাঝেই জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান—যাকে সবাই চেনে “বোটানিক্যাল গার্ডেন” নামে—তাদের জন্য একটা ছোট্ট আশ্রয় খুলে দিয়েছে, যেখানে জুতো খুলে প্রকৃতিকে আবার ছুঁয়ে দেখা যায়।
নতুন এই জায়গাটার নাম “বেয়ারফুট ট্রেইল”—খালি পায়ে হাঁটার পথ। শুনতে সাধারণ, কিন্তু আসলে এটা শহরের জীবনে এক অচেনা বিলাসিতা। এখনকার দিনে আমরা মাটির গন্ধ ভুলে গেছি, নরম কাদা আর কাঁকর পাথরের স্পর্শ কেমন, সেটা আর মনে পড়ে না। এই ট্রেইলে পা রাখলে সেই ভুলে যাওয়া অনুভূতিটা ধীরে ধীরে ফিরে আসে।
বোটানিক্যাল গার্ডেনের এই ট্রেইলটা খুব দীর্ঘ নয়, কিন্তু বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সাজানো। কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে পথটাকে—কোথাও শুকনো বালি, কোথাও নরম মাটি, আবার কোথাও কাঠের গুঁড়ি, ভেজা বালি, নুড়ি পাথর কিংবা কাদামাটি। প্রতিটি স্তরে পায়ের তলায় দেয় আলাদা অনুভূতি।
শুকনো বালিতে হাঁটলে মনে হয় যেন সমুদ্রসৈকতে আছি, নরম মাটিতে পা ডুবে গেলে শৈশবের খেলাধুলোর সময়টা ফিরে আসে। কাঠের টুকরোর উপর হাঁটলে একটু শক্ত, আবার কাদা মাখা পথে পা দিলে ঠান্ডা এক সুখানুভূতি ছড়িয়ে পড়ে শরীরে।
একজন দর্শনার্থী হাসতে হাসতে বললেন, “আমি তো প্রথমে একটু ভয় পেয়েছিলাম—এই বুঝি কাদা লাগবে, কিন্তু পরে বুঝলাম এই কাদা আসলে একটা আরাম। শহরের ধুলোয় এমন আরাম তো পাওয়া যায় না!”
বিশেষজ্ঞরা বলেন, খালি পায়ে হাঁটা শুধু মনের শান্তির জন্য নয়, শরীরেরও উপকার করে। পায়ের তলায় যেসব স্নায়ু আছে, সেগুলোর সঙ্গে শরীরের অনেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের যোগসূত্র। তাই বিভিন্ন ধরনের পৃষ্ঠে হাঁটলে রক্ত চলাচল বাড়ে, মানসিক চাপ কমে, ঘুম ভালো হয়।
বোটানিক্যাল গার্ডেনের একজন কর্মকর্তা জানালেন, “আমরা চাই মানুষ এখানে এসে শুধু গাছ-ফুল দেখবে না, প্রকৃতিকে অনুভব করবে। বেয়ারফুট ট্রেইল সেই অভিজ্ঞতার অংশ। ভবিষ্যতে আমরা শিশুদের জন্য বিশেষ সেশন রাখার পরিকল্পনাও করছি।”
মিরপুরের এই উদ্যান বরাবরই নগরবাসীর জন্য এক নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা। কিন্তু এই নতুন ট্রেইল সেই অভিজ্ঞতাকে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। সকালবেলায় দেখা যায়, অনেকে জুতো হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছেন। কেউ বাচ্চাকে সঙ্গে এনেছেন, কেউ একা—সবাই কোনো না কোনোভাবে মাটির ছোঁয়া খুঁজছেন।
একজন বৃদ্ধা বললেন, “বয়স হয়েছে, হাঁটাচলায় কষ্ট হয়। কিন্তু এই পথটায় পা রাখলেই মনে হয় শরীর হালকা হয়ে গেছে।”
এই উদ্যোগটি বাংলাদেশে একেবারেই নতুন। পৃথিবীর নানা দেশে খালি পায়ে হাঁটার পথ জনপ্রিয়, বিশেষ করে ইউরোপে। সেখানে একে বলা হয় “Barefoot Park”—প্রকৃতির সঙ্গে পুনঃসংযোগের এক ধরণ। বোটানিক্যাল গার্ডেনের এই ট্রেইল সেই ধারাটাকেই বাংলাদেশের মাটিতে এনে দিয়েছে।
যদি এ ধরনের উদ্যোগ আরও বাড়ানো যায়—ঢাকার অন্য পার্ক, স্কুল কিংবা রিসোর্টগুলোতেও—তাহলে নগরজীবনের যান্ত্রিকতা একটু হলেও কমবে।
বোটানিক্যাল গার্ডেনের এই “বেয়ারফুট ট্রেইল” হয়তো খুব ছোট একটা প্রকল্প, কিন্তু এর প্রভাব বড়। শহরের মানুষকে আবার মাটির গন্ধে ফিরিয়ে আনা, প্রকৃতির সঙ্গে একটু সময় কাটানোর সুযোগ দেয়া—এটাই তো আসল উদ্দেশ্য।
এক বিকেলে যখন সূর্যের আলো গাছের পাতায় ছায়া ফেলে, কেউ ধীরে ধীরে কাদা ভেজা পথে পা রাখে—তখন মনে হয়, প্রকৃতি এখনও আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে। শুধু জুতো খুলে নিতে হয়।