বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কিছু বিকেল আছে, যেগুলো শুধুই সময় নয়—একটা মর্মস্পর্শী অনুভূতি। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের চারপাশে আজ তেমনই এক বিকেল দেখা গেল। শনিবার (৮ অক্টোবর) বিকাল চারটা। হালকা শীতের হাওয়া, আকাশে শিশুরা রঙিন বেলুন উড়িয়ে যেন জানিয়ে দিল—নতুন কিছুর শুরু হলো।
এই উৎসবের মধ্য দিয়েই আত্মপ্রকাশ করল বাংলাদেশ আবৃত্তি ফেডারেশন—দেশের বিভিন্ন আবৃত্তি সংগঠন ও আবৃত্তিশিল্পীদের অভিভাবক প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে এক ছাতার নিচে একত্রিত হওয়ার ভাবনা ছিল; আজ সেটি রূপ পেল বাস্তবে।
বিকেল চারটার আগে থেকেই শহিদ মিনারের চত্বরে জমতে শুরু করে মানুষের ভিড়। কেউ কেউ ব্যাগে বই এনেছেন, কেউ শিশুর হাত ধরে এসেছেন। তাদের চোখে মুখে কৌতূহল, আনন্দ আর এক ধরনের গর্ব—কারণ এই আয়োজন শুধু শিল্পের নয়, এটি এক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ।
বেলা সাড়ে তিনটায় শুরু হয় আনন্দ শোভাযাত্রা।
“বাংলার গৌরবময় ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম ও ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের চেতনায়—একাত্ম বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার।” সেই অঙ্গীকারই যেন শোভাযাত্রার প্রতিটি পদক্ষেপে ধ্বনিত হচ্ছিল।
শিশুদের হাতে বেলুন, কারও গলায় কবিতার পঙ্ক্তি—
“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…”
বেলুন উড়ল আকাশে। উড়তে উড়তে মিলিয়ে গেল নীলের ভেতর। মনে হচ্ছিল, ওগুলো যেন বাংলাদেশের সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে উঠছে—অবিনাশী, মুক্ত।
এই প্রতীকী উড়ানে উপস্থিত ছিলেন ফেডারেশনের সভাপতি আবৃত্তিশিল্পী মেহেদী হাসান ও সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান, সঙ্গে কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যরা। উদ্বোধনী ঘোষণাপত্র পাঠ করেন সাধারণ সম্পাদক নিজেই। তাঁর কণ্ঠে দৃঢ় প্রত্যয়—
“আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে প্রতিটি উচ্চারণ হবে মুক্তির ভাষায়, যেখানে আবৃত্তি হবে মানবিকতার পক্ষে।”
উদ্বোধনের পর শুরু হয় অনুষ্ঠান। প্রথমেই সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত। তারপর ছোট ছোট মুখগুলো একে একে মঞ্চে উঠে আসে। ঋদ্ধস্বর, কিনান লার্নিং সেন্টার, মহাপৃথিবী—শিশুদের এই দলগুলো যখন কবিতা বলছে, তখন শহিদ মিনারের পাদদেশে দাঁড়ানো মানুষরা নিঃশব্দে শুনছে।
এক মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, এ যেন কোনো আবৃত্তি অনুষ্ঠান নয়—এ যেন বাংলাদেশের আত্মার উৎসব।
ফেডারেশনের আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানাতে মঞ্চে উঠে আসেন জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি মোহন রায়হান। তাঁর বক্তব্যে ছিল আশাবাদ—
“আবৃত্তি শুধু শিল্প নয়, এটি প্রতিবাদের ভাষা। ফেডারেশনের এই সূচনা আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে নতুন গতি দেবে।”
বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, আবৃত্তিশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা তাঁদের শুভেচ্ছা জানান। অনুষ্ঠানটি রূপ নেয় এক অনানুষ্ঠানিক মিলনমেলায়।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে আবৃত্তি শুধু শিল্প নয়—এটি ছিল এবং আছে প্রতিবাদের, মানবতার, ও বোধের প্রকাশ । ভাষা আন্দোলনের সময় থেকে মুক্তিযুদ্ধ, এরপর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—সব সময় কবিতার শব্দই মানুষকে সাহস জুগিয়েছে।
আজ সেই ধারার উত্তরসূরি হিসেবে বাংলাদেশ আবৃত্তি ফেডারেশনের যাত্রা শুরু হলো। এটি কেবল সংগঠনের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ নয়, বরং সংস্কৃতির আরেক নতুন জাগরণের প্রতিশ্রুতি।
সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। শহিদ মিনারের গায়ে পড়ছে নরম সোনালি আলো। শিশুরা ছুটোছুটি করছে, হাতে এখনও কিছু বেলুন। এক বৃদ্ধ কবি পাশে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে বললেন—
“বাংলাদেশ টিকে থাকবে, যতদিন কবিতা টিকে আছে।”
তারপর তিনি হাসলেন, যেন এক আশ্বস্ত মানুষ।
আজকের এই আত্মপ্রকাশ সেই হাসির মতোই—নিঃশব্দ, অথচ গভীর অর্থবাহী।