শতবর্ষী গ্রন্থাগারের বই লুট: পুরোনো বই ব্যবসার অন্ধকার দিক

ইরফান শেখ

বাংলাদেশে পুরাতন বই বিক্রি হয় নীলক্ষেতে। কোভিড মহামারির পর নীলক্ষেতের ডিজিটাইজেশন হয়। টিকে থাকার জন্য প্রথমবারের মতো পুরোনো বইয়ের বিক্রেতারা অনলাইনে আসেন। আগে যারা পুরোনো বই কিনতে যেতেন তারা ছিলেন নির্দিষ্ট ঢাকা দক্ষিণ এলাকার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাসিন্দা। এদের সংখ্যা ৩ থেকে ৫ লাখের বেশি নয়। কিন্তু মহামারির পর দোকানগুলো অনলাইনে গেলে ক্রেতা রাতারাতি ৫ লাখ থেকে বেড়ে ৫ কোটিতে পৌঁছে।

অনলাইন মার্কেটে কোনো বাধা নেই। যশোরের নিশিমনি থেকে শুরু করে উত্তরার পদ্মলোচনের কাছে প্রথমবারের মতো পুরোনো বইয়ের বাজার উন্মুক্ত হয়। চাহিদা বেশি, যোগান কম—ফলে পুরোনো বইয়ের দাম বেড়ে যায় অন্তত সাত থেকে আট গুণ। এত বেশি বাড়ে যে নতুন ও পুরোনো বইয়ের দামের ব্যবধান দাঁড়ায় বড়জোর ৫০ টাকা। এ রকম দামে নতুন এক শ্রেণির ক্রেতা যুক্ত হয়, যারা বেছে বেছে প্রাচীন বইপত্র খোঁজে। বইয়ের বয়স ১০০ বছর বা তার বেশি হলে তারা অতিরিক্ত দাম দিতে শুরু করে। বইতে যদি রবীন্দ্রনাথ বা শেখ মুজিবের স্বাক্ষর থাকে, তাহলে তো কথাই নেই—দাম বেড়ে হয় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

নীলক্ষেতের পুরোনো বই ব্যবসায়ীরা এসব বোঝেন না। তারা লেখক, সময়, সংস্করণ, কোনটার কত দাম এসব জানেন না। তাই তারা সাহায্যের জন্য শিক্ষিত বেকার যুবকদের শরণাপন্ন হন। দুই বছরের মধ্যে ওই যুবকেরা উনাদের সাহায্য করতে গিয়ে উনাদেরকেই মার্কেট থেকে সরিয়ে দেন। সে কারণে নীলক্ষেতে গিয়ে এখন আর ‘লুঙ্গি মুস্তফা’ বা ‘শাহজাহান চাচা’দের খুঁজে পাওয়া যায় না।

অন্যসব কালেকশন যেমন তেমন, কিন্তু পুরোনো বই আর পাণ্ডুলিপির কালেকশন একধরনের মরণব্যাধি—বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে। কেন এটা মানসিক ব্যাধি, সেটা পরে বলছি। আপাতত এই পুরোনো বই বাজারের ফিরিস্তি শুনুন।

পুরোনো বই সংগ্রহের বাতিক বেড়ে যাওয়ায় দাম ক্রমে বাড়তে থাকে। আমি নিজের চোখে রুবাইয়াত বই দেড় লাখ টাকায় বিক্রি হতে দেখেছি। কিন্তু পুরোনো বই তো উৎপাদন করা যায় না। বাজারে নতুন মাল যোগানের একমাত্র উপায় ছিল দেশের শতবর্ষী লাইব্রেরি ও কালেকশনগুলো ডাকাতি করা।

শিক্ষিত তরুণ পুরোনো বই বিক্রেতাদের মধ্যে একদল নির্দিষ্ট চক্র মাফিয়া হয়ে ওঠে। তাদের কাজ হয় দেশের ব্রিটিশ আমলের কলেজ লাইব্রেরির কর্মচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা, তাদের ঘুষ দেওয়া। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, কারমাইকেল কলেজ, ব্রজমোহন কলেজ, সরকারি গুরুদয়াল কলেজ, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ—এসব জায়গা থেকে নিয়মিত বই চুরি হতে থাকে। রাতারাতি নয়, প্রতি সপ্তাহে অল্প অল্প করে। অথর্ব কলেজ শিক্ষার্থী ও কর্তৃপক্ষের অমনোযোগে এটা সম্ভব হয়—যাদের সঙ্গে বই-পুস্তকের কোনো সম্পর্কই নেই।

আমি নিজে পাঁচটি আলাদা গ্রন্থাগারের পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। এসব দেখে আমি গ্রন্থাগারগুলোকে সাবধান করি। পুরোনো বই আলাদা করে আর্কাইভ করি, সেগুলো পাঠকদের বাসায় নিয়ে যাওয়া বন্ধ করি এবং আলমারিতে তালা দিই।

২০২০ থেকে ২০২২ সালে আমি একটি জাদুঘরে চাকরি করতাম। সারা দেশে গণমানুষের এই ঐতিহ্যের লুটপাট ও সামাজিক ধ্বংস দেখে আমার বুক ফেটে যায়। বই বিক্রেতাদের প্রতি আমার রাগ নেই, কষ্ট লাগে যে এসব বইয়ের ক্রেতা তথাকথিত শিক্ষিত সাহিত্য ও গবেষণা অনুরাগীরা। যারা শিক্ষিত হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু খোদা তা’আলা তাদের বিবেক দেননি।

আমি জাদুঘরের এক সদয় কর্মকর্তাকে রাজি করাই—এই বইগুলো বাঁচাতে হবে। জনগণের সম্পত্তি যতটা সম্ভব জনগণের এখতিয়ারে রাখতে হবে।

২০২২ সালে সরকারি গুরুদয়াল কলেজ ও ভিক্টোরিয়া কলেজের অনেক বই আমরা প্রতিষ্ঠানের টাকায় ক্রয় করে জাদুঘরে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করি। কিন্তু সরকার ও জাদুঘর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে সে বছরই আমি চাকরি ছেড়ে দিই, কাজটি স্থগিত হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আমি যখন গণভবনে ছিলাম, তখনও আমার মূল উদ্বেগ ছিল রাষ্ট্রীয় নথিপত্র ও দলিল বাঁচানো। খুব চেষ্টা করেও সংসদ ভবনের আর্কাইভসে পৌঁছাতে পারিনি।

এখনও আমি শতবর্ষী লাইব্রেরি থেকে লুট হওয়া বইপত্র কিনছি—তবে সেগুলোকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি না বানিয়ে জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখছি। এই কাজে কিছু ব্যবসায়ী গাঁটের পয়সা খরচ করে সাহায্য করছেন। অন্যদিকে যেসব শিক্ষিত মানুষ জনগণের সম্পত্তি কিনে ব্যক্তিগত কালেকশন তৈরি করছেন, তাদের সঙ্গে দেখা করে অন্তত ফটোকপি করেও বইয়ের তথ্য সংরক্ষণের চেষ্টা করছি।

তথ্য হলো জ্ঞান। জ্ঞান হারানো সহজ, কিন্তু কোটি টাকা দিলেও সেই সময়ের জ্ঞান পুনরুত্পাদন করা যায় না। শিল্প বা ঐতিহাসিক মূল্যের কথাই বা বাদ দিই কেন।

দেশের শতবর্ষী কোনো লাইব্রেরিই এখন সুরক্ষিত নয়। ক’দিন আগে আমি ঢাকা সেনানিবাস গ্রন্থাগারের বই পর্যন্ত কিনেছি। বাকি লাইব্রেরির নিরাপত্তা তো আরও নড়বড়ে।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেননি, “জাহানারা ইমামের বই বিক্রি করে দাও।” মোহাম্মদ আজমও বলেননি। তারা পাগল নন।
বাংলা একাডেমির কর্মচারীদের গলায় পাড়া দিন। জিজ্ঞেস করুন, ওরা বই নিয়ে কী করে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *