দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে দেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গত বছরের ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে বেআইনি হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এই রায় দেওয়া হয়েছে। এই রায়কে ঘিরে দেশজুড়ে উত্তেজনা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তুঙ্গে উঠেছে।
২০২৪ সালের সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হওয়া শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন একপর্যায়ে সরকারবিরোধী বৃহৎ গণআন্দোলনে রূপ নেয়। সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলন দমনে ব্যাপক সহিংসতা, গুলি, ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ওই সময়ে দেড় হাজারের মতো মানুষ নিহত এবং প্রায় ২৫,০০০ জন আহত হন ।
আন্দোলনের চাপে শেখ হাসিনা গত বছর ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান । এরপর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই সরকারের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল — গণহত্যার বিচার।
সোমবার (১৭ নভেম্বর) ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ রায় ঘোষণা করা হয়। বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সব অভিযোগেরই প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
যে মামলার রায় হয়েছে, এই মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। সেগুলো হলো উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান; প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার নির্দেশ; রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা; রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় আন্দোলনরত ছয়জনকে গুলি করে হত্যা এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যা করা।
এর মধ্যে উসকানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য শেখ হাসিনাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার শাস্তি হয়েছে ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ প্রমাণিত হওয়ায়।
ড্র্রোন ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের অবস্থান শনাক্ত, হেলিকপ্টার ব্যবহার করে গুলি, প্রাণঘাতী গুলি ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূল এবং চানখাঁরপুল ও আশুলিয়ায় গুলি করে হত্যার অপরাধে তাঁকে দেওয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ড।
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালকেও চানখাঁরপুল ও আশুলিয়ায় গুলি করে হত্যার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। তবে এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া একমাত্র আসামি, তৎকালীন পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনের শাস্তি হয়েছে পাঁচ বছর কারাদণ্ড। অপরাধ প্রমাণে সহায়তা করায় তাঁর শাস্তির মাত্রা কম বলে জানিয়েছেন বিচারক।
তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে চীফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ‘যে ধরনের সাক্ষ্যপ্রমাণ এই আদালতে উপস্থাপিত হয়েছে, বিশ্বের যেকোনো আদালতের স্ট্যান্ডার্ডে এই সাক্ষ্যপ্রমাণগুলো উতরে যাবে এবং পৃথিবীর যেকোনো আদালতে এই সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা হলে আজ যেসব আসামিকে শাস্তি প্রদান করা হয়েছে, তাঁরা প্রত্যেকেই একই শাস্তিপ্রাপ্ত হবেন।’
শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে থাকায় তাঁর পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত একজন আইনজীবী রায় শুনানিতে অংশ নেন। পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের পক্ষে এই মামলায় রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী ছিলেন মো. আমির হোসেন। তবে হাসিনা এই ট্রাইব্যুনালকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ ও ‘রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন ।
রায় ঘোষণার পর সারাদেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। রায়ের প্রতিবাদে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ সারাদেশে হরতালের ডাক দিয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি স্থানে বোমা বিস্ফোরণ ও যানবাহনে আগুন দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে ।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ড একটি ঐতিহাসিক রায়। এই রায়ের গভীর তাৎপর্য উপলব্ধি করে অন্তর্বর্তী সরকার সর্বস্তরের জনগণকে শান্ত, সংযত ও দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান জানাচ্ছে।
এদিকে, ভারত সরকার এখনও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে নয়াদিল্লির কাছে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন জানানো হয়েছে ।
এই রায় দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, এটি বিচারের শুরু ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন অধ্যাপক নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন,
“এই রায় যদি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে, তবে তা হবে গণতন্ত্রের জয়। আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে এই রায়ের প্রভাব পড়বে নিঃসন্দেহে। তবে প্রশ্ন থেকে যায় —
এই রায় কি সত্যিই বিচারের শুরু, না কি আরেকটি রাজনৈতিক খেলার অংশ?