বিজয় মজুমদার
বিহার রাজ্যের ২০২৫ সালের বিধানসভা নির্বাচন এবারের রাজনীতির পাতায় সবচেয়ে বড় চমক নিয়ে এসেছে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের পতন। প্রায় দুই দশকের নির্বাচনী পরিসংখ্যানে যে গ্রাফ ধীরে ধীরে কমছিল, এ বছর এসে তা নেমেছে সর্বনিম্ন স্তরে।
সরকার গঠন, জোটের পালাবদল—সবকিছুর আলোচনাকে ছাপিয়ে এবার যে প্রশ্নটি বিশ্লেষকদের সামনে উঠে এসেছে, তা হলো: ১৭.৭ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যার রাজ্যে মাত্র ১০ জন মুসলিম বিধায়ক কিভাবে নির্বাচিত হলো?
বিহার বিধানসভার ২৪৩টি আসনের মধ্যে এবারের নির্বাচনে এনডিএ জোট পেয়েছে ২০২টি আসন। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন মহাজোট পেয়েছে মাত্র ৩৫টি। রাজনীতির বড় ঢেউ যখন এনডিএর দিকে মোড় নিল, তখন মুসলিম প্রতিনিধিত্বের হিসাব বইয়ে দেখা গেলো এক আশ্চর্য শূন্যতা। এবার মুসলিম বিজয়ী হয়েছেন মাত্র ১০ জন—বিহারের নির্বাচনী ইতিহাসে সবচেয়ে কম।
এআইএমআইএম: আনসারুল ইসলাম, গোলাম সারোয়ার, তওসীফ আলম, মোহাম্মদ সারোয়ার, মুর্শিদ আলম
আরজেডি: আসিফ আহমেদ, ওসামা শাহাব
জেডিইউ: মোহাম্মদ জামা খান
কংগ্রেস: মোহাম্মদ কেমারুল হুদা, আবিদুর রহমান
বিহারের মতো জনঘনত্বপূর্ণ, বহুধর্মীয় রাজ্যে এই সংখ্যা বিশ্লেষকদেরও বিস্মিত করেছে।
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে বিভিন্ন দলের প্রার্থী তালিকায়। এবারের নির্বাচনে প্রায় সব বড় দলই মুসলিম প্রার্থী কম দিয়েছে।
মাঠপর্যায়ের বহু সংগঠক বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলো এবার “জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা”কে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে ব্যবহার করেছে। ফলে মুসলিমপ্রধান এলাকাগুলো বাদে খুব কম ক্ষেত্রেই প্রার্থী ঘোষণায় মুসলিম নেতাদের জায়গা হয়েছে।
যেখানে মুসলিম প্রার্থী সংখ্যা কমে গেছে, সেখানে বিজয়ের সম্ভাবনা এমনিতেই সঙ্কুচিত হয়েছিল।
বিহারের নির্বাচন ইতিহাসে মুসলিম বিজয়ীদের সংখ্যা কখনোই খুব বেশি ছিল না, তবে এত কমও ছিল না—
- ২০১০ সালে নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯ জন
- ২০১৫ সালে সংখ্যাটি লাফিয়ে ওঠে ২৪-এ
- ২০২০ সালে আবার কমে দাঁড়ায় ১৯-এ
- ২০২৫ সালে এসে তা নেমে মাত্র ১০ জনে
এই ধস নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—বিহারে মুসলিম ভোট কি আর রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রয়োজনীয় কৌশলগত শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে?
এবার মুসলিমপ্রধান অনেক এলাকাতেই ভোটার উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। স্থানীয় পর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা যায়, অনেক আসনে মুসলিম ভোটাররা সারাদিন লাইন ধরে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু ভোটের সেই শক্তি প্রতিফলিত হয়নি ফলাফলে।
অন্যদিকে, মুসলিম ভোট বিভিন্ন দল ও প্রার্থীর মধ্যে ছড়িয়ে যাওয়ায় বহু আসনে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে পড়ে। যে কারণে কিছু জায়গায় মুসলিম প্রার্থী ভোট পেলেও জয় পায়নি।
মুসলিম ভোট দীর্ঘদিন ধরে বিহারের রাজনীতিতে একটি প্রভাবশালী উপাদান। কিন্তু এবারের নির্বাচন সেই প্রভাবের সীমানাকেই বদলে দিয়েছে। দলগুলো মুসলিম প্রার্থী কমিয়েছে, ফলে মুসলিম প্রতিনিধিত্বও কমেছে—এটা পরিষ্কার।
রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এটি শুধুই সংখ্যার খেলা নয়। এটি রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যতেও একটি নতুন বার্তা—মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক অবস্থান আগের চেয়ে দুর্বল হচ্ছে।
মুসলমান নেতাদের সংখ্যা যেমন কমেছে, তেমনি হ্রাস পেয়েছে ভোটের প্রভাব। বিহারের মতো একটি বৃহৎ রাজ্যে যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ, সেখানে মাত্র ১০ জন প্রতিনিধি তাদের কথা বলতে পারবে—এ বাস্তবতা রাজনীতির পরবর্তী অধ্যায়কে আরো জটিল করে তুলবে।
আগামী নির্বাচনে এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রার্থী বাছাইয়ের নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে, আর মুসলিম ভোটারদের মধ্যেও দরকার হবে নতুন ধরনের রাজনৈতিক সংগঠন ও নেতৃত্ব।