ইতিহাস বিভাগের দুই তারকা

বিজয় মজুমদার

বাংলাদেশ ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা ব্যাটারদের তালিকা করলে মুশফিকুর রহীম নিঃসন্দেহে প্রথম সারিতেই থাকবেন। শততম টেস্ট খেলেই শুধু রেকর্ড গড়েননি; ওই ম্যাচে সেঞ্চুরি করে আরেকটি অনন্য অর্জনও যোগ করেছেন তিনি।
মুশফিক যেমন দেশের ক্রিকেটের গর্ব, তেমনি গর্বের আরেক নাম মাসুদুর রহমান মুকুল—তবে ব্যাট-বলে নয়, আম্পায়ারের পোশাকে।

দুজনকে শুধু ক্রিকেটই নয়, আরও একটি বন্ধনে যুক্ত করেছে—তাঁরা দুজনেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র। একসময়ের একই বিভাগের এই দুই প্রতিনিধি আজ ভিন্ন ভূমিকায় ক্রিকেটকে সমৃদ্ধ করছেন। আর মুশফিকের শততম টেস্টে মুকুল স্মরণ করলেন তাঁরই বিভাগের এই কৃতি জুনিয়রকে।

খেলোয়াড় হিসেবে যেমন সেরা, ঠিক তেমনি নীতি-আদর্শেও দৃঢ়। অর্থের সঙ্গে নীতির সংঘাত দেখা দিলে মুশফিক সবসময় বেছে নিয়েছেন নীতিকে। বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে প্রথম যখন ‘পুল প্রথা’ চালু হলো, তখন অনেক খেলোয়াড় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। সেরা ক্রিকেটারদের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সাজিয়ে দেওয়া হতো, আর প্রতিটি দল একটি ক্যাটাগরি থেকে সর্বোচ্চ চারজনকে নিতে পারত। উদ্দেশ্য ছিল দলগুলোর শক্তির বৈষম্য কমানো, কিন্তু বাস্তবে বেশ কিছু তারকা ক্রিকেটারের মূল্য কমে যায়।

সেই সময় জাতীয় দলের সদস্য হয়েও মুশফিককে প্রত্যাশিত অর্থ দিতে রাজি হয়নি কোনো দল। এ অবস্থায় তিনি ঘোষণা দেন—তিনি প্রিমিয়ার লিগের কোনো ক্লাব দলে খেলবেন না। কিন্তু তাঁর দ্বিতীয় ঘোষণা সবার কপালে ভাঁজ ফেলে দেয়। তিনি জানালেন, খেলবেন সেই দলে—যে দল তাঁকে একটাকাও দিতে পারবে না।

এরপরই দলগুলো তৎপর হয়। বাড়তি অর্থের প্রস্তাব আসে। কিন্তু মুশফিকের সিদ্ধান্ত একই—তিনি খেলবেন সম্মানের জন্য, অর্থের জন্য নয়।

শেষ পর্যন্ত তিনি খেললেন বিকেএসপির হয়ে—যে প্রতিষ্ঠান তাঁকে জাতীয় দলে ওঠার পথ তৈরি করে দিয়েছিল। সে মৌসুমে তিনি সর্বোচ্চ রানের তালিকায় শীর্ষের কাছাকাছি থাকলেও বিকেএসপি থেকে এক টাকাও নেননি।
মুশফিকের যুক্তি ছিল—
“যেহেতু কেউ আমাকে আমার উপযুক্ত মূল্য দিতে চাইছে না, তাহলে আমি খেলব সেই দলের হয়ে যারা আমাকে আজকের জায়গায় পৌঁছাতে সহায়তা করেছে।”

মাসুদুর রহমান মুকুল ও মুশফিকুর রহীম—একই বিশ্ববিদ্যালয়, একই বিভাগ। তবে মুকুল সিনিয়র, মুশফিক জুনিয়র। তবুও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠান হোক, বা খেলার মাঠ—একসঙ্গে থাকলে মুশফিক প্রায়ই অন্যদের সামনে রসিকতার সুরে মুকুলকে পরিচয় করিয়ে দেন,
“উনি আমার বিভাগের ছোট ভাই।”

এর পেছনে আছে একটি গল্প। প্রতিভাবান ক্রিকেটার হলেও বিভিন্ন চোট আর পরিস্থিতির কারণে জাতীয় দলে খেলা হয়নি মুকুলের। খেলোয়াড়ি ক্যারিয়ার কখনো পুরোপুরি প্রস্ফুটিত হয়নি। খেলার মাঠে প্রথম পরিচয়ের পর যখন মুশফিক জানলেন মুকুল তাঁরই বিভাগের সিনিয়র, তখন তাঁকে ‘বড় ভাই’ বলে ডাকতে শুরু করেন। একদিন বিনয়ী মুকুল বলেছিলেন, “আপনি খেলোয়াড় হিসেবে অনেক বড়।”

এতে মুশফিক হেসে উত্তর দেন, “ভাই, খেলার মাঠে বড়ই থাকেন। ইতিহাস বিভাগে না হয় আমার ছোট ভাই থাকেন।”

তারপর থেকে এই রসিক পরিচয়টাই স্থায়ী হয়ে গেছে। আজও একসঙ্গে থাকলে মুশফিক আগ বাড়িয়ে বলেন— “এই যে উনাকে দেখছেন, ইনি কিন্তু আমার বিভাগীয় ছোট ভাই।”

একজন বাংলাদেশের ইতিহাস বদলে দেওয়া উইকেটরক্ষক-ব্যাটার। আরেকজন আন্তর্জাতিক মানের আম্পায়ার।
দুজনের যাত্রা আলাদা হলেও শেকড় একই।
মুশফিকের শততম টেস্ট তাই শুধু ক্রিকেটীয় অর্জনের স্মারক নয়—দুই ইতিহাস বিভাগের ছাত্রের মানবিক সম্পর্ক, সম্মান আর স্মৃতিরও রঙিন অধ্যায়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *