বাংলাদেশি আম্পায়ারদের বিশ্বমঞ্চে উঠার গল্প

 

বাংলাদেশের হকির ইতিহাসে খুব বেশি আলোচিত গল্প নেই। মাঠে খেলার উত্তাপ থাকে, কিন্তু আম্পায়ারদের নীরব সাফল্য সাধারণত আলোচনার বাইরে থেকে যায়। ঠিক সেই জায়গাটাতেই নতুন অধ্যায় লিখলেন দুজন বাংলাদেশি—ইন্টারন্যাশনাল এলিট প্যানেল আম্পায়ার লাকী সেলিম এবং ইন্টারন্যাশনাল আম্পায়ার শাহবাজ আলী। জুনিয়ার ওয়ার্ল্ড কাপে দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া এই দুজনকে আজ সম্মাননা দিয়েছে ওস্তাদ ফজলু হকি একাডেমি। ঘটনাটা ছোট নয়; আসলে বাংলাদেশের হকির দীর্ঘ পথচলায় এটি একটি মাইলফলক।

বাংলাদেশে হকি বহুদিন ধরেই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। খেলার মান, অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ—সবকিছুরই উন্নতির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কিছু মানুষ নীরবে এগিয়ে গেছেন। বিশেষ করে আম্পায়ারিং–এ বাংলাদেশ খুব কমই আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করতে পেরেছে। যে কারণে লাকী সেলিম ও শাহবাজ আলীর সাম্প্রতিক সাফল্যকে শুধু ব্যক্তিগত অর্জন বলা যাবে না; এটি পুরো দেশের উন্নতির প্রতীক।

লাকী সেলিমের পরিচিতি এখন আন্তর্জাতিক হকি মহলে। এলিট প্যানেলে জায়গা পাওয়া কোনো সহজ বিষয় নয়। নিয়ম, শৃঙ্খলা, সিদ্ধান্তের দৃঢ়তা—সব দিক দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে হয়। দেশীয় লিগ থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার টুর্নামেন্টগুলোতে তাঁর শান্ত ও স্থির আম্পায়ারিং-স্টাইল অনেকদিন ধরেই নজর কাড়ছিল। বিশ্ব হকি সংস্থার মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি এখন বিশ্বমানের টুর্নামেন্ট পরিচালনার দায়িত্ব পান নিয়মিতভাবে।

জুনিয়ার ওয়ার্ল্ড কাপ তাঁর জন্য আরও একটি বড় মঞ্চ। সেখানে দায়িত্ব পালন করলে এলিট তালিকায় তাঁর অবস্থান আরও শক্ত হবে, যা ভবিষ্যতে সিনিয়র বিশ্বকাপ বা অলিম্পিকে আম্পায়ারিংয়ের দরজাও খুলে দিতে পারে।

শাহবাজ আলীর যাত্রাটাও বেশ সংগ্রামের। বাংলাদেশের হকিতে আম্পায়ার হতে গেলে যেমন প্রশিক্ষণের ঘাটতি কাটাতে হয়, তেমনি আন্তর্জাতিক মানে ওঠার আগে প্রয়োজন নানা পাশ—লিখিত পরীক্ষা, ফিটনেস, নিয়ম-কানুনের গভীর জ্ঞান। এগুলো সবই শাহবাজ আলী ধীরে ধীরে অর্জন করেছেন।

তিনি একসময় জেলা লিগ থেকে শুরু করেছিলেন। স্থানীয় ম্যাচে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতে করতে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তাঁর নাম ইন্টারন্যাশনাল আম্পায়ার তালিকায় যুক্ত হয়। এবার তিনি বিশ্বকাপের আসরে মাঠে দাঁড়াবেন—এটি তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

আজকের অনুষ্ঠানে লাকী সেলিম ও শাহবাজ আলীকে সম্মাননা জানিয়ে ওস্তাদ ফজলু হকি একাডেমি জানিয়েছে, এ অর্জন পুরো হকি পরিবারের। দীর্ঘদিন ধরে একাডেমিটি তরুণ খেলোয়াড় তৈরি করলেও এবার তারা দুটি আন্তর্জাতিক আম্পায়ারের সম্মাননায় এগিয়ে এসেছে। এটি হকি সংস্কৃতির দৃষ্টিভঙ্গিতেও এক পরিবর্তন—শুধু খেলোয়াড় নয়, ম্যাচ পরিচালনাকারীরাও যে দেশের অমূল্য সম্পদ, সেটির সামাজিক স্বীকৃতি তৈরি হচ্ছে।

হকি অ্যাকাডেমি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশও তাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছে, এ অর্জন দেশের তরুণ আম্পায়ারদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

এই দুই আম্পায়ারের যাত্রা দেখাচ্ছে যে অবকাঠামো সীমিত হলেও ব্যক্তিগত নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রম মানুষকে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আম্পায়াররা যত বেশি দায়িত্ব পাবেন, ততই বাংলাদেশের নাম বিশ্ব হকির আলোচনায় আসবে। আর আন্তর্জাতিক মানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিজ্ঞতা দেশে ফিরলে সেটি স্থানীয় লিগকেও উন্নত করবে।

বাংলাদেশে হকির কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি একদিনে হবে না। কিন্তু লাকী সেলিম ও শহবাজ আলীর সাফল্য প্রমাণ করছে—পথটা খোলা হয়েছে, এখন সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *