নুরুল ইসলাম বাবুল
বর্তমান সময়ে দেশজুড়ে এক অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যেখানে নিপীড়িতরাই নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে এবং যারা ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করছিল, তারাই ফ্যাসিবাদী আচরণ করছে। এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন হতাশার জন্ম দিচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে জনমনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করছে। জুলুমের মোকাবিলায় ইনসাফ এবং সহিংসতার প্রত্যুত্তরে সহমর্মিতার পরিবর্তে যারা নতুন মাত্রার জুলুম ও সহিংসতা চালাচ্ছে, তাদের এই কার্যকলাপ ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থানের কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
ফ্যাসিবাদ একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ, যা সাধারণত চরম জাতীয়তাবাদ, স্বৈরাচারী শাসন, বিরোধীদের দমন এবং সহিংসতাকে সমর্থন করে। ঐতিহাসিকভাবে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম দীর্ঘ ও কঠিন ছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, যারা একসময় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল, তারাই ক্ষমতায় এসে ভিন্নমত দমনে ফ্যাসিবাদী পথ অবলম্বন করছে। এটি সমাজের জন্য এক অশনি সংকেত।
যখন জুলুমের জবাব জুলুম দিয়ে দেওয়া হয় এবং সহিংসতার মোকাবিলা সহিংসতা দিয়ে করা হয়, তখন সমাজে এক অন্তহীন চক্রের সৃষ্টি হয়। এই চক্র কেবল সংঘাতকেই বাড়িয়ে তোলে, শান্তির পথ রুদ্ধ করে দেয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলুমকে ইনসাফ দিয়ে এবং সহিংসতাকে দরদ দিয়ে প্রতিস্থাপন না করা হলে, বর্তমানের এই কার্যকলাপ ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরুত্থানের পথ প্রশস্ত করবে।
একটি সুস্থ ও গণতান্ত্রিক সমাজে চিন্তা ও আচারের বৈচিত্র্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন রাষ্ট্র বা সমাজ ভিন্নমতকে দমন করে, মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও জীবনযাপনকে বাধাগ্রস্ত করে, তখন ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ইতিহাসে দেখা গেছে, যখনই ভিন্নমতাবলম্বীদের উপর জুলুম চালানো হয়েছে, তখনই সমাজে অস্থিরতা বেড়েছে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্ষুণ্ন হয়েছে।
যদি সমাজে চিন্তা ও আচারের বৈচিত্র্যকে বাধাগ্রস্ত করা হয় এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের উপর জুলুম চলতে থাকে, তাহলে জুলাই বিপ্লবের মতো ঐতিহাসিক পরিবর্তনও ব্যর্থ হতে পারে। জুলাই বিপ্লব যদি মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার প্রতীক হয়, তবে ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপ সেই বিপ্লবের মূল উদ্দেশ্যকেই নস্যাৎ করে দেবে।
তাসাওফপন্থী, ফকির, বাউলসহ সকল ভিন্নমতাবলম্বীদের উপর সব ধরনের জুলুম বন্ধ করার জোর দাবি জানানো হয়েছে। এই ধরনের জুলুম কেবল মানবাধিকারের লঙ্ঘন নয়, বরং এটি সমাজের বহুত্ববাদ এবং সহনশীলতার ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। প্রতিটি মানুষের নিজস্ব বিশ্বাস ও জীবনযাপন পদ্ধতিকে সম্মান জানানো একটি সভ্য সমাজের পরিচয়।
বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জুলুম ও সহিংসতার এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ইনসাফ ও দরদকে ভিত্তি করে একটি নতুন সমাজ গড়ার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। চিন্তা ও আচারের বৈচিত্র্যকে সম্মান জানানো এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের উপর সব ধরনের জুলুম বন্ধ করা অপরিহার্য। অন্যথায়, ফ্যাসিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।