রিদওয়ান হাসান
দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার আদর্শিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল রাজনৈতিক আধিপত্য, উপনিবেশিক দমননীতি এবং মুসলিম সমাজের নৈতিক পুনর্গঠনের পটভূমিতে। তাই শাসকের সঙ্গে আলেমদের সম্পর্ক বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অন্যান্য ধারার তুলনায় বেশি ভারসাম্যপূর্ণ, আত্মমর্যাদাশীল এবং নৈতিকভাবে স্বাধীন। দেওবন্দি চিন্তায় এই সম্পর্ক কখনো অন্ধ আনুগত্য নয়, আবার সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতাও নয়—বরং নৈতিক দূরত্ব ও দায়িত্ববোধের সমন্বিত এক অবস্থান।
দেওবন্দি আকাবিরদের প্রধান উদ্বেগ ছিল আলেমদের নৈতিক স্বাধীনতা। তাদের মতে, শাসকের ঘনিষ্ঠতা যদি সত্য বলা বা অন্যায়ের প্রতিবাদে আলেমকে দুর্বল করে তোলে, তবে সেই সম্পর্ক গ্রহণযোগ্য নয়। হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবি রহ. বিভিন্ন নসিহতে আলেমদের সতর্ক করে বলেছেন—রাষ্ট্রক্ষমতার সান্নিধ্য বাড়লে দুনিয়াবি প্রভাব ও লোভের আশঙ্কাও বাড়ে। তাই আলেমের দায়িত্ব হলো নিজের ইলম, চরিত্র ও আকিদার স্বচ্ছতা অটুট রাখা।
মাওলানা রশিদ আহমাদ গাঙ্গুহি এবং মাওলানা কাসেম নানুতুবি রহ.-এর বক্তব্যও একই সুরে। তাদের মতে, আলেমের আসল কাজ সত্য বলা; কারণ জালেম শাসকের সামনে সত্য উচ্চারণ করাকে ইসলামে জিহাদের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তাই সত্য প্রকাশে দৃঢ়তা না থাকলে শাসকের দরবারে উপস্থিতি বৈধ হয় না। তবে তারা এটাও মনে করেন, সম্পূর্ণ দূরত্ব রাখা সব সময় জনস্বার্থবান্ধব নয়। দরকারি সময়ে পরামর্শ দেওয়া, অন্যায়ের প্রতিরোধে সাক্ষাৎ করা—এসবকেও তারা বৈধ এবং দায়িত্বস্বরূপ বলেছেন।
এই নীতিগত ভারসাম্য ইসলামি রাজনৈতিক দর্শন ও সুফি নৈতিকতার যৌথ প্রকাশ। উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক মুরুব্বিরা দীর্ঘদিন ধরে আলেমদের শাসকের দরবার থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে উৎসাহ দিয়েছেন—নফস, মোহ ও দুনিয়া যেন তাদের প্রভাবিত করতে না পারে। অন্যদিকে নববী আদর্শ আলেমদের নির্দেশ দেয় শক্তির কেন্দ্রগুলোর সামনে সত্য ও ন্যায় তুলে ধরতে। দেওবন্দ এই দুই প্রবাহকে “দূরত্ব ও দায়িত্ব”—এই দুই নীতিতে সংক্ষেপিত করেছে। অর্থাৎ সম্পর্ক এমন হবে, যাতে আলেম কখনো শাসকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে, তবে সমাজ ও দ্বীনের কল্যাণে প্রয়োজন হলে তাদের প্রভাব ব্যবহার করতে পারে।
দেওবন্দি দৃষ্টিতে জনকল্যাণ একটি মৌলিক মানদণ্ড। শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় থেকেও কখনো ক্ষমতাসীনদের নৈতিক বিচ্যুতি মেনে নেননি। তার মতে, আলেমদের দায়িত্ব হলো জনগণকে রক্ষা করা এবং ক্ষমতাসীন পক্ষকে ভুলনীতি থেকে ফিরিয়ে আনা। এ ধারণা ‘ইকামাতুল হক’ ও ‘ইযালাতুল বাতিল’-এর ধ্রুপদি নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে দেওবন্দের মানদণ্ডে শাসকের সঙ্গে সম্পর্ক তখনই মূল্যবান, যখন তা ন্যায়, ইনসাফ ও জনস্বার্থ প্রতিষ্ঠার উপায় হয়। কিন্তু ব্যক্তিগত সুবিধা, প্রভাব বিস্তার বা ক্ষমতায় ভাগ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা দেখা গেলে সেই সম্পর্ক তৎক্ষণাৎ নিন্দনীয় হয়ে ওঠে—ফিকহি ও নৈতিক উভয় দৃষ্টিতেই।
সংকটময় সময়ে আলেম–শাসক সম্পর্ক কখনো জরুরি হয়ে উঠতে পারে—যখন মুসলিম জনগোষ্ঠী বিপন্ন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে অথবা ন্যায়ের পক্ষে শাসকের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার সুযোগ থাকে। ইতিহাসে বহু উদাহরণ আছে, যেখানে আলেমদের সময়োচিত পরামর্শ অস্থিরতা কমিয়েছে এবং দমনমূলক নীতি শিথিল করেছে। তবে এখানেও দেওবন্দের শর্ত একই—আলেম যেন সত্যবাদিতা থেকে বিচ্যুত না হন এবং আত্মমর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখেন।
দেওবন্দি দৃষ্টিভঙ্গি একদিকে আলেমদের নৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে, অন্যদিকে রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রয়োজনীয় পথও খোলা রাখে। এই ভারসাম্যই তাদের রাজনৈতিক-নৈতিক চিন্তার মূল শক্তি।