মাহামুদুল হাসান
ইন্টারনেটে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের ২০২৫ সালের সেরা ছবিগুলোর তালিকা ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ চোখে পড়ে এক শান্ত অথচ শোকাতুর দৃশ্য— টাইগ্রিস নদীতে পবিত্র রিভার রিচুয়াল পালন করছেন কয়েকজন মান্ডায়েন নারী। সেই ছবি শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়; তা যেন সাক্ষ্য দিচ্ছে বিলুপ্তির পথে হাঁটা এক প্রাচীন জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম, ইতিহাস এবং প্রতিরোধের।
এক বিলুপ্তপ্রায় ধর্মের শেষ শেকড়
মান্ডায়িজম মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রাচীন গ্নোস্টিক ধর্মীয় মতবাদ। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর যে কয়েকটি ক্ষুদ্র ধর্মীয় সম্প্রদায় সবচেয়ে ভয়াবহ এথনিক ক্লিঞ্জিংয়ের শিকার হয়েছিল, তাদের মধ্যে মান্ডায়েনরা অন্যতম। একসময় ইরাক-ইরানের টাইগ্রিস–ইউফ্রেটিস নদীতীরবর্তী অঞ্চলে ১০–৩০ হাজার অনুসারীর একটি সম্প্রদায় ছিল তারা। আজ সংখ্যা নেমে এসেছে এক হাজারেরও নিচে— কেউ খুন হয়েছে, কেউ দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।
আলোর ধর্ম, নদীর ধর্ম
মান্ডায়েনরা একেশ্বরবাদী। তারা বিশ্বাস করে এক সর্বোচ্চ স্রষ্টা Hayyi Rabbi— “মহা জীবন”-এ। তাদের কাছে নদী হলো আধ্যাত্মিক আলোর জগৎের প্রতীক, আর “জীবন্ত পানি”তে ডুব দেওয়া তাদের ধর্মের কেন্দ্রীয় আচার। এ রিচুয়াল শুধু পরিশুদ্ধতার নয়; এটি মানুষের আধ্যাত্মিক জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি।
জন দ্য ব্যাপটিস্ট তাদের প্রধান নবী। তবে যিশু বা মুহাম্মদকে নবী মানে না তারা। তাদের ধর্মগ্রন্থ Ginza Rabba লেখা হয়েছে প্রাচীন মান্ডায়িক ভাষায়, যা আরামাইকের একটি শাখা।
মেসোপটেমিয়ার গ্নোস্টিক ধারার উত্তরাধিকার
মান্ডায়েনদের ইতিহাস প্রায় দেড়-দুই হাজার বছরের পুরোনো। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সেই সময়ে ইহুদি, খ্রিস্টান, জরথুষ্ট্রিয়ানসহ নানা ধর্মীয় ধারার ভিতর যে গ্নোস্টিক প্রবণতা ছিল, মান্ডায়িজম সেইসব প্রভাবের মাঝেও নিজের স্বতন্ত্র দর্শনে বেঁচে থাকে। তারা বিশ্বাস করে জগত দুই রূপে বিভক্ত— আলো (আত্মিক বিশুদ্ধতা) ও অন্ধকার (পার্থিব অপবিত্রতা)। মানুষের আত্মা মূলত আলোর জগতের বাসিন্দা, কিন্তু পৃথিবীতে বন্দী। তাই নদীর অবিরাম প্রবাহ তাদের কাছে সেই ‘আলো জগতের’ স্মৃতি।
বহু শতাব্দীর নিপীড়ন
ইসলাম আগমনের পর প্রাথমিক পর্যায়ে মান্ডায়েনরা “People of the Book” হিসেবে কিছুটা সুরক্ষা পেলেও পরবর্তী যুগগুলোতে তাদের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। করের বোঝা, জোরপূর্বক ধর্মান্তর, আচার পালনে বাধা— সব মিলিয়ে তারা শহর ছেড়ে নদীতীরের নিরিবিলি গ্রামে সরে যেতে বাধ্য হয়।
অনেক শাসক তাদের Ginza Rabba নিষিদ্ধগ্রন্থ হিসেবে গণ্য করে পুড়িয়ে দিয়েছে, লুকাতে বাধ্য করেছে।
খ্রিস্টান ইতিহাসে তাদের “হেরেটিকস” বলা হয়েছে— কারণ তারা যিশুকে নবী মানে না, বরং জন দ্য ব্যাপটিস্টকে সর্বোচ্চ স্থানে রাখে।
ইহুদীদের সাথেও টানাপোড়েন ছিল; মান্ডায়েনরা নিজেদেরকে “বিশুদ্ধ গ্নোস্টিক” ধারার অনুসারী মনে করত, যা প্রচলিত ইহুদি ধারার বাইরে।
আধুনিক যুগে পতনের তীব্রতা
১৯৮০–২০০৩ সাল পর্যন্ত ইরাকের অস্থির রাজনীতিতে তারা মার্জিনালাইজড হয়ে পড়ে। এরপর ২০০৩ সালের মার্কিন আগ্রাসনের পর ইরাক ভেঙে পড়লে জঙ্গি সংগঠনগুলো সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালাতে থাকে। ফল— ইরাকের ৯০% এর বেশি মান্ডায়েন হয় শরণার্থী, নয়তো মৃত্যু বরণ করে।
পুরোহিত সংকট আর রিচুয়ালের অস্তিত্বহানি
মান্ডায়েন সমাজের তিন স্তর—
- তালাপা: সাধারণ অনুসারী
- শাম্মাশ: ধর্মীয় সহকারী
- তার্মিদি ও গানজিব্রা: উচ্চ পুরোহিত
পুরোহিত তৈরি হয় বিশেষ বংশধারা ধরে, দীর্ঘ নদীতীরবর্তী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। ইউরোপ বা অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় নেওয়া মান্ডায়েনদের পক্ষে সেই অনুশীলন আর সম্ভব নয়। ফলে তাদের ধর্মীয় নেতৃত্ব হুমকির মুখে। যে ধর্ম টিকে আছে “yardna”— উত্তরে বয়ে দক্ষিণে প্রাকৃতিক নদীর প্রবাহ— সেই নদী ছাড়া তার মূল আচার পালনের পথও প্রায় বন্ধ।
শেষ আলো ধরে রাখার সংগ্রাম
আজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কয়েক হাজার মান্ডায়েন তাদের পরিচয়ের এক বড় বাধার মুখে— এন্ডোগ্যামি বা নিজেদের মধ্যেই বিয়ের শতবর্ষী নিয়মও ভেঙে গেছে। শরণার্থী জীবনে তারা মিশে গেছে নানা ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের সাথে। নতুন প্রজন্ম নিজের ধর্মীয় ভাষা, আচার, ইতিহাস থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।
মানব সভ্যতার সবচেয়ে প্রাচীন গ্নোস্টিক ধর্মগুলোর একটি মান্ডায়িজম— টিকে আছে এখনো, কিন্তু সময় আর বাস্তুচ্যুতি বলছে, তাদের আলোর পথ শেষ হয়ে আসছে দ্রুত। তবুও টাইগ্রিসের জলে যারা দাঁড়িয়ে আচার পালন করেন, তারা বয়ে চলা স্রোতে এখনো স্পর্শ করেন “মহা জীবনের” সেই প্রাচীন আলো— যা হয়তো তাদের শেষ উত্তরাধিকার।