প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) আয়োজন করেছিল সেনা কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ। আমন্ত্রণ এসেছিল সাভার ক্যান্টনমেন্টের জিওসি মেজর জেনারেল এস এম আসাদুল হকের কাছ থেকে। আর প্রশিক্ষণের চতুর্থ দিনের সনদ অর্পণ অনুষ্ঠানে ছিলেন নবম পদাতিক ডিভিশনের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহিদ হোসেন—তিনি ছিলেন দিনের মেজবান, আর তার বক্তব্য পুরো আয়োজনে এনে দেয় শান্ত, আত্মবিশ্বাসী ছন্দ।
অনেক প্রশিক্ষকই প্রথম দিন ভেবেছিলেন—“সেনাবাহিনীর সামনে সাংবাদিকতা শিখানোর বিষয়টা কেমন দাঁড়াবে?”
অন্যদিকে সেনা কর্মকর্তাদেরও মনে ছিল সংশয়—“মিডিয়ার দুনিয়া তো আমাদের পরিচিত ক্ষেত্র নয়!”
কিন্তু ক্লাসরুমে আলোচনার প্রথম রাউন্ডেই অচেনা ভাবটা ধীরে ধীরে গলে গেল।
জটিল প্রশ্নের সঙ্গে তারা যেমন পরিচিত, তেমনি বিশ্লেষণাত্মক মনোভাবও তাদের স্বভাবজাত। ফলে ‘ফ্যাক্ট চেক’, ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট’, ‘ডিসইনফরমেশন’ বা ‘এআই–ভিত্তিক সাংবাদিকতা’—সব বিষয়ের আলোচনায় তারা অংশ নিলেন সমান দক্ষতায়।
প্রশিক্ষকদের একজন পরে বললেন—“আমরা ভেবেছিলাম শুধু আমরা শেখাব। কিন্তু দিন শেষে আমরা বুঝলাম—আমরাও শিখেছি।”
এই চার দিনের বড় শক্তি ছিল ‘দেয়া–নেওয়া’। সেনা কর্মকর্তারা মাঠের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে আনলেন। সাংবাদিকেরা দেখালেন তথ্যের নির্ভরযোগ্য পথ, নৈতিকতার নিয়ম এবং জনমতের দায়বদ্ধতা।
আলোচনায় উঠে এলো যে—সংবাদ তৈরি হোক বা অপারেশন পরিকল্পনা, উভয় পেশাতেই দ্রুত সিদ্ধান্ত, তথ্য যাচাই এবং সঠিক মুহূর্তে যোগাযোগ—সবই জরুরি।
একজন কর্মকর্তা বললেন—“সঙ্কটের সময় মিডিয়া কমিউনিকেশন হয়তো আমরা যেভাবে ভাবতাম, বিষয়টা আসলে তার চেয়েও বড়।”
ক্যান্টনমেন্টের কঠোরতার ভেতরও আছে সৌজন্য, শৃঙ্খলিত আচরণ এবং সম্মানবোধ। সাংবাদিকদের প্রতি সেনা কর্মকর্তাদের সেই সম্মান স্পষ্ট ছিল প্রতিটি ক্লাসে।
চায়ের টেবিলে আলোচনা চলেছে— কেউ বলেছেন জাতিসংঘে কাজের অভিজ্ঞতা, কেউ বলেছেন দুর্যোগ মোকাবিলার সময় মানবিক সংকট কীভাবে সামাল দেন, আর সাংবাদিকেরা শোনালেন কিভাবে একটি ভুয়া তথ্য পুরো দেশকে বিভ্রান্ত করতে পারে।
এভাবে ধীরে ধীরে গড়ে উঠল এক অদৃশ্য সেতু—সেনা ইউনিফর্ম আর কলমের শক্তির মধ্যে।
শেষ দিনের অনুষ্ঠানে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহিদ হোসেনের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত পরিমিত। তিনি বললেন—তথ্য এখন যুদ্ধক্ষেত্রের অস্ত্রের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক তথ্য মানুষকে রক্ষা করে, ভুল তথ্য অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
তিনি প্রশিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অফিসারদের বললেন—“জ্ঞান শক্তি। তবে দায়িত্ববোধ ছাড়া সে শক্তির মূল্য নেই।”
এই কথাটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবার মনে ছাপ ফেলে।
চার দিনের এই প্রশিক্ষণ শুধু কিছু স্লাইড দেখা কিংবা তত্ত্ব শেখার বিষয় ছিল না। এটি ছিল বোঝাপড়া তৈরির একটি মানবিক অভিজ্ঞতা—
- কে কীভাবে কাজ করে
- কোন পরিস্থিতিতে কোন ভাষা ব্যবহার করা উচিত
- কোন তথ্য কীভাবে যাচাই হয়
- আর সংকটের মুহূর্তে মিডিয়া ও সামরিক বাহিনী কীভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারে
সব মিলিয়ে প্রশিক্ষণের পর সেনা কর্মকর্তাদের অভিব্যক্তি ছিল—“আমরা শুধু সাংবাদিকতা বুঝলাম না, সাংবাদিকদেরও বুঝলাম।”
আর সাংবাদিকদের উপলব্ধি—“সেনাবাহিনী কতটা পেশাদারভাবে যোগাযোগ করে, তা কাছ থেকে না দেখলে বোঝা যায় না।”
সেনা অফিসার আর সাংবাদিক—দুই পেশার মানুষ দুই জগত থেকে আসে। তবু তাদের লক্ষ্য এক: দেশকে সুরক্ষিত রাখা, মানুষকে সচেতন রাখা, এবং সত্যকে সামনে আনা।
সাভার ক্যান্টনমেন্টের এই চার দিন দেখিয়ে দিল, দুই পেশার মধ্যে দূরত্ব যতটাই হোক, বোঝাপড়ার সুযোগ পেলেই তা ঘুচে যায়। এখন দরকার এই অভিজ্ঞতাকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া—যাতে তথ্য, দায়িত্ব ও দেশপ্রেমের সেতু আরও মজবুত হয়।