বাংলাদেশের বিচার বিভাগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের হতাশা, ক্ষোভ এবং সন্দেহ জমে আছে। আদালত মানে ধীরগতি, মামলা ঝুলে থাকা, অজানা প্রভাব, অভিজ্ঞতার অভাব—এ যেন এক অদৃশ্য জটের ভেতরে আটকে থাকা প্রতিষ্ঠান। এই বাস্তবতার মাঝেই আজ একটি বড় পরিবর্তনের ঘোষণা এসেছে। বিচার বিভাগের জন্য স্বশাসিত সচিবালয় গঠনের গেজেট প্রকাশ করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
ঘোষণাটি রাজনৈতিক উত্তাপের সময় এসেছে। পন্ডিতদের দিকে তাকালে দেখা যাবে—কেউ প্রশ্ন তুলছেন এমন একটি সিদ্ধান্ত কি নির্বাচিত সরকারের অনুমতি ছাড়াই নেওয়া ঠিক হলো? আবার অনেকেই এটিকে স্বাধীন বিচার বিভাগের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলছেন। তবে সাধারণ মানুষের মনোভাব একেবারে আলাদা। তারা এতদিন ধরে যে বিচারহীনতার ব্যথা বয়ে বেড়িয়েছে, তার প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্তকে তারা স্বস্তি আর আশার জাগানোর মতোই দেখছে।
দীর্ঘদিন ধরে বিচার বিভাগ কার্যত প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কর্মী নিয়োগ, বদলি, প্রশিক্ষণ—বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্বাহী বিভাগের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। এর ফলে বিচারকদের স্বাধীনতা অনেকসময় সীমিত হয়ে যেত।
স্বশাসিত সচিবালয় মানে হলো—বিচার বিভাগ এবার নিজেই নিজের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেবে। এটি শুধু কাঠামোগত পরিবর্তন নয়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দরজা খুলে দেওয়ার একটি বাস্তব পদক্ষেপ।
এটি অনেকটা নিজের ঘরে নিজের চাবির মালিক হয়ে যাওয়ার মতো। এতদিন সেই চাবি ছিল অন্যের হাতে।
এটি কি সব সমস্যার সমাধান?
না, এটি কেবল শুরু।
এখনো দেশের বহু মানুষ আদালতের নাম শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কারণ তারা জানে—এখানে ন্যায় পাওয়া মানে অপেক্ষা, দৌড়াদৌড়ি, খরচ আর অনিশ্চয়তা। একজন সাধারণ মানুষের চোখে বিচার বিভাগ অনেকটা এমন এক জটিল যন্ত্র যার ভেতরে ঢুকলে বারবার আটকে যেতে হয়।
এই অবস্থা বদলাতে হলে শুধু কাঠামো নয়—সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
একটি ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থা দাঁড় করাতে যেসব ধাপ প্রয়োজন হতে পারে—সেগুলো সহজ ভাষায় এমনই:
১. সৎ ও যোগ্য বিচারক নিয়োগ
বিচারকের চেয়ার শুধু মর্যাদা নয়, দায়িত্বেরও কেন্দ্র। এখানে মেধা, সততা আর নিরপেক্ষতা—তিনটিই অপরিহার্য। জনগণ চায় এমন বিচারক, যাকে দেখে তারা আশ্বস্ত হতে পারে।
২. দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর জবাবদিহি
বিচার ব্যবস্থার মধ্যে দুর্নীতির ছায়া থাকলে ন্যায়বিচার কখনোই মানুষের জীবনে পৌঁছাতে পারে না। অনেকের উপলব্ধি—বিচারপ্রার্থীর কাছে বিচার পাওয়ার আগে ‘সমস্যা মেটানোর’ জন্য লুকিয়ে থাকা অনেক দরজা খুলে যায়। এগুলো বন্ধ করতে হবে।
৩. দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার নিষ্পন্ন
বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা মামলার ফাইল দেখলে যে কোনো মানুষ হতাশ হয়। বিচার পাওয়ার পথে এই বিলম্ব ন্যায়কে ধ্বংস করে দেয়। দ্রুত নিষ্পত্তির সময় এসেছে।
৪. মামলার জট ছাড়ানো
বাংলাদেশের আদালতগুলো এখনো লাখো ঝুলে থাকা মামলার ভারে নুয়ে আছে। এটি শুধু সংখ্যা নয়, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে হতাশা, অপেক্ষা, ক্ষতি আর মানুষের জীবন।
৫. সবার জন্য সহজ ন্যায়বিচার
আইন সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা, আইনি সহায়তা পাওয়া, মামলা পরিচালনা করা—এসব সাধারণ মানুষের কাছে কঠিন বাস্তবতা। ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার সহজ করা জরুরি।
৬. রাজনৈতিক প্রভাব থেকে বিচার বিভাগকে মুক্ত রাখা
এটাই হয়তো সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়। ক্ষমতার ছায়া যদি আদালতের ওপর পড়ে, তবে ন্যায়বিচার কখনোই পুরোপুরি স্বাধীন হতে পারে না।
আজকের সিদ্ধান্তকে দেশের মানুষ স্বাগত জানালেও সামনে যে দীর্ঘ পথ—সেটা তাদের কাছেও স্পষ্ট। একটি প্রতিষ্ঠান বদলাতে সময় লাগে, কিন্তু সেই যাত্রা শুরু হওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই উদ্যোগ অনেকের কাছে সাহসী মনে হচ্ছে। যারা এই পরিবর্তনের কাজে নিঃস্বার্থ ভূমিকা রেখেছেন—তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা থেকে যাচ্ছে, কারণ এটি কেবল প্রশাসনিক সাফল্য নয়, মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি।
ন্যায় কাগজে লেখা সিদ্ধান্তে নয়—মানুষের জীবনে ফিরে আসার মধ্যেই তার আসল মূল্য। স্বশাসিত সচিবালয় সেই ফিরে আসার প্রথম আলো হয়ে উঠতে পারে—যদি সামনে থাকা পথটি সততা, দক্ষতা এবং দায়বদ্ধতার সঙ্গে অতিক্রম করা যায়।
আজকের এই সিদ্ধান্ত তাই কেবল একটি গেজেট নয়—এটি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার নতুন সূচনা, যার ওপর ভর করে মানুষ নতুনভাবে ন্যায়বিচারের স্বপ্ন দেখতে শুরু করতে পারে।