পানি শোধনের ক্লোরিন যেভাবে যুদ্ধক্ষেত্রের অস্ত্র

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সুদানের জাতীয় সেনাবাহিনী (SAF) ও র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (RSF)-এর মধ্যে চলমান গৃহযুদ্ধের সময় রাজধানী খার্তুমের ৬০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত আল-জাইলি তেল পরিশোধনাগার এলাকায় দুটি বায়ুবহনযোগ্য বোমা হামলা হয়। ধ্বংসস্তূপের মাঝে পড়ে থাকা সবুজ-হলুদ রঙের ড্রামগুলোর গায়ে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল “লিকুইড ক্লোরিন”। বিশ্লেষকেরা নিশ্চিত করেছেন, এগুলোই ছিল ভারত থেকে আমদানিকৃত পানি-বিশোধন ক্লোরিন—যা যুদ্ধক্ষেত্রে বিষগ্যাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ।

ভারতের রাসায়নিক প্রতিষ্ঠান Chemtrade International Corporation ১৭টি ড্রামে ১৭ টন তরল ক্লোরিন রপ্তানি করে সুদানে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান Ports Engineering Company ভারতীয় রপ্তানিকারককে জানায়, ক্লোরিন “শুধুমাত্র পানি বিশোধনের জন্য” ব্যবহৃত হবে । কোম্পানিটি দাবি করে, তারা নীল নদী পানি বোর্ড ও তাওইলা পানি সরবরাহ প্রকল্প–এর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। কিন্তু ইউনিসেফ জানায়, তাওইলা প্রকল্পে  ক্লোরিন গ্যাস নয়, ক্লোরিন গুঁড়ো ব্যবহৃত হয় এবং ইউনিসেফের কাছে এই সিরিয়াল নম্বরের কোনো সিলিন্ডার নেই ।

Ports Engineering–এর মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক  সেনাবাহিনীর একজন কর্নেল। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে “উন্নত পানি-চিকিৎসা” উল্লেখ থাকলেও, পাশাপাশি তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদকদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে । ২০২৩ সালের যুদ্ধ শুরুর পর কোম্পানিটি কেবল ক্লোরিনই নয়, গোলাবারুদ ফিডার “স্প্রিং” আমদানি করেছে—যা মেশিনগানের লিংক বেল্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয় ।

৫ ও ১৩ সেপ্টেম্বরের হামলায় ড্রাম দুটি বিমান থেকে ফেলা হয়; স্থানীয় ইঞ্জিনিয়ার জানান, লিকেজে একাধিক কর্মী অজ্ঞান ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন । সিরিয়াল নম্বর “GC-1983-1715” সম্বলিত ড্রামটি মুম্বাই→জেদ্দা→পোর্ট সুদান রুটে জাহাজে এসে ৯ আগস্ট সুদানে পৌঁছায়; মাত্র তিন সপ্তাহ পরেই তা যুদ্ধক্ষেত্রে দেখা যায় ।

সুদানে ১ কোটি ৭৩ লাখ মানুষ নিরাপদ পানির অভাবে; ক্লোরিনের একটি ড্রাম ২৪ কোটি লিটার পানি বিশুদ্ধ করতে পারে—যা খার্তুমে ফেরত আসা ১০ লাখ উদ্বাস্তুর তিন মাসের চাহিদা মেটায় । অথচ ১২৫টি ড্রামের মাত্র দুটির অবস্থান জানা গেছে; বাকি ১২৩টির গন্তব্য অজ্ঞাত। পানীয়জল সংকটের মাঝেই রাসায়নিক অস্ত্র হিসেবে ক্লোরিন ব্যবহার যুদ্ধাপরাধের শামিল ।

রাসায়নিক অস্ত্র নিষেধজ্ঞা চুক্তি (CWC) অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে স্বাক্ষরকারী সুদান ক্লোরিন অস্ত্র ব্যবহার করলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের মুখোমুখি হতে পারে—যদিও দেশটি আদালতের এখতিয়ার স্বীকার করে না ।

ফ্রান্স-২৪ একাধিকবার সুদান সেনাবাহিনী ও সরকারের বক্তব্য চাইলেও কোনো সাড়া পায়নি। যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ সালের মে-জুনে সুদানের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে; সুদান সরকার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে কমিটি গঠনের কথা জানালেও, এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো তদন্ত রিপোর্ট দেয়নি ।

পানির মজুদ কমে আসা ও কলেরা-সংক্রমণের ভয়াবহতা যখন দেশজুড়ে, তখন পানি বিশোধনের জন্য অপরিহার্য ক্লোরিনের চালান যুদ্ধক্ষেত্রে বিষগ্যাস হিসেবে ব্যবহার করা শুধু মানবিক বিপর্যয়ই নয়, আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সুদানের জনগণের পানির অধিকার রক্ষা করা এবং যুদ্ধাপরাধের দায়ে জড়িতদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা—উভয়ই এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কর্তব্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *