রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় রোববার (৭ই ডিসেম্বর) দুপুরে খাদ্যে ভেজাল ও বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক দূষণ রোধে উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।
খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ, ভারী ধাতু, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, তেজস্ক্রিয়তা ও জৈবদূষণ—এসব কারণে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয়গুলো ছিলো
- পোল্ট্রি ফার্মে অনিয়ন্ত্রিত ওষুধ ব্যবহারের নজরদারি
- কৃষিতে অবৈধ কীটনাশক নিয়ন্ত্রণ
- খাদ্যে সীসা ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি কমাতে উদ্যোগ
- পানি, মাছ ও দুগ্ধজাত পণ্যে রাসায়নিক দূষণ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ
- বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণায় সহযোগিতা
- দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগ নির্ধারণ
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কৃষি ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বৈঠকে জানায়—বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রতি ১০ জনে ১ জন শিশু বছরে অন্তত একবার খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত শিশুদের এক-তৃতীয়াংশের মৃত্যু ঘটে এসব রোগে। প্রতি বছর বিশ্বে ৬০ কোটি এবং বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি শিশু খাদ্যবাহিত রোগে ভোগে।
বিএফএসএ জানায়—দেশে পরীক্ষাকৃত ১৮০টি খাদ্য নমুনার মধ্যে ২২টিতে অতিরিক্ত সীসা পাওয়া গেছে। ইউনিসেফের জরিপ বলছে, বাংলাদেশে সাড়ে তিন কোটি শিশু সীসা সংক্রমণের ঝুঁকিতে। সীসা দেহে জমে মস্তিষ্ক, যকৃৎ, কিডনি ও হাড়ে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। শিশুদের বুদ্ধিবিকাশ ব্যাহত হয়। গবেষণায় ৫% গর্ভবতী নারীর দেহেও সীসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
পরিবেশ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে সীসা দূষণ কমাতে ১০ বছরের কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান—হাঁস-মুরগির খামারে অনিয়ন্ত্রিতভাবে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হচ্ছে। ওষুধ প্রয়োগের ৭–২৮ দিন পর্যন্ত এর প্রভাব থাকে, কিন্তু অনেক খামার ২৮ দিনের আগেই মুরগি বাজারজাত করে। এতে মানবদেহে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করছে। কিছু চোরাপথে পরিচালিত পোল্ট্রি ফার্ম কর্তৃপক্ষের নজরদারি এড়িয়ে এসব কাজ করছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা পানি ও মাছের নমুনায় ৩০০ ধরনের ওষুধ, ২০০ ধরনের কীটনাশক এবং ১৬ ধরনের PFAS পাওয়া গেছে বলে গবেষণায় জানানো হয়।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন— “আমাদের সন্তান থেকে শুরু করে সবাই এই সংকটের ভুক্তভোগী। তাই নিজেদের স্বার্থেই একসঙ্গে কাজ করতে হবে।” তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে খাদ্য দূষণ মোকাবিলার কার্যকর প্রস্তাবনা লিখিত আকারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী সায়েদুর রহমান জানান— দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ল্যাব আছে। শিক্ষার্থীদেরও এসব পরীক্ষা পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে। সমন্বিত গবেষণা দ্রুত শুরু করলে খাদ্যে সীসার পরিমাণ নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
খাদ্য উপদেষ্টা বলেন— খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে নিরাপত্তার বিষয়টি কখনো কখনো উপেক্ষিত হচ্ছে। গণমাধ্যম জনসচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাঠ্যপুস্তকেও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।